১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

শঙ্কর চক্রবর্তীকে বলেছিলাম তুমি যদি কালী ব্যানার্জির অভিনয় দেখে থাকো সেটা ভুলে যাও

ভারতীয় চলচ্চিত্রের পুরোধা ব্যক্তিত্ব দেবকীকুমার বসুর সুযোগ্য পুত্র তিনি। ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রথম আবহসঙ্গীত, প্রথম কৃত্রিম আলো, মঞ্চাভিনয়ের প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে চলচ্চিত্রের জন্য পৃথক অভিনয়ের ধরন, দেবকী বসুর অবদানকে এক কথায় ধরা সততই কঠিন। ১৯৩৪ সালে দ্বিতীয় ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সীতা’ ছবির জন্য যে সাম্মানিক ডিপ্লোমা পুরস্কার পান দেবকী বসু, সেটাই ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম বৈদেশিক স্বীকৃতি। এমন ব্যক্তিত্বের পুত্র হয়ে দেবকুমার বসু কিন্তু স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। বাবার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র বানিয়েছিলেন অসমিয়া ভাষায়। তবে আরও বেশি দুঃসাহসিক কাজ ছিল মণিপুরি ছবির পথ-প্রদর্শক হয়ে ওঠা। মণিপুরের ভাষা মেইতেইতে প্রথম ছবি তৈরি হয় দেবকুমার বসুর পরিচালনা। নাম ‘মাতমগি মণিপুর’। ১৯৭২ সালের ৯ এপ্রিল মুক্তি পায় সেই ছবি। আজ পঞ্চাশ বছরে পদার্পণ করে ফেলল মণিপুরের প্রথম ছবিটি। দেবকুমার বসুর আরও একটি অসাধারণ সৃষ্টি একসময়ে বাংলার ঘরে ঘরে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কলকাতা দূরদর্শনের পর্দায় সম্প্রচারিত ‘বিবাহ অভিযান’-এর পরিচালকও ছিলেন তিনি। সাতাশি বছরের ‘তরুণ’ দেবকুমারভিন্নসময়-এর প্রতিনিধি সোহম দাসের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন সেই বর্ণময় জীবনের কথা। আজ তার শেষ পর্ব।

 

  • অসমিয়ার ভাষায় ছবি করেছিলেন, তারপর মেইতেই ভাষায়। যে ভাষায় আপনি অভ্যস্ত নন, সেখানে কাজ করতে গিয়ে ভাষার ব্যবধানটা কীভাবে মিটিয়েছিলেন?

খুব সুন্দর প্রশ্ন। অভিনেত্রী দুর্গা খোটে, যিনি সেইসময়কার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়িকা ছিলেন, তিনিও ছিলেন বাবার ছাত্রী। তাঁকে বাবা বলেছিলেন, ঠোঁট নড়ে, কথা বলে চোখ। আমি যত অন্যান্য ভাষায় ছবি করেছি, যে ভাষা আমার জানা নেই, সেখানে আমি পরিচালনা করার সময় সোজাসুজি শিল্পীদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আর যেহেতু আমার ছবির স্ক্রিপ্ট আমি লিখতাম, ডায়লগ আমারই ছিল, আর ওরা শুধু অনুবাদের কাজটা করত, আমি সেটা শুনে নিতাম, ফলে পুরো ব্যাপারটা আমি জানতাম।

 

তোমায় একটা ঘটনা বলি এই প্রসঙ্গে। আমি যখন মণিপুরি ছবি করছি, তখন কলকাতায় কিছু সাংবাদিক আমায় এই একই প্রশ্ন করেছিল। আমি তাদেরকে উত্তর দিয়েছিলাম, আমি চলচ্চিত্রের ভাষা জানি। আর বাবার ওই কথাটাও বলতাম যে, কথা বলে চোখ, ঠোঁট শুধু নড়ে। ‘মাতমগি মণিপুর’ করার সময়ে আমি পাহাড়ের কাছে একটা দৃশ্য শুট করছি। শ্যাম শর্মা আমার ছবিতে ইন্টারপ্রেটারের কাজ করেছিলেন। তখন দূরে কোথাও আছেন। আমি আমার সহকারীকে শট ডিভিশন দিয়ে বললাম, ওদের করতে বলো। কিন্তু দুটো টেক হয়ে যাওয়ার পরেও আমি সন্তুষ্ট হতে পারছি না। এবার আঞ্চলিক ছবিতে অত বেশি টেক নেওয়াও যায় না। কারণ, খরচে কুলোয় না। যে হিরোইন ছিল, ইয়েংখোম রোমা, তাকে গিয়ে বললাম, তুমি তো ভালো অভিনয় করো, তোমাকে তো শেখালাম, তুমি তারপরেও ফেল করছ কেন? সে আমায় বলছে, নো স্যার, আমি তো যা আছে স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী, তাইই করছি। আমি বললাম, তুমি আবার করো। করল, কিন্তু আবারও সেই একই ভুল হচ্ছে দেখছি। ততক্ষণে শ্যাম শর্মা এসে গেছে। আমি বললাম, ও বোধহয় ঠিকমতো বুঝতে পারছে না। তোমাদের ভাষায় ওকে বোঝাও তো। শ্যাম শর্মা স্ক্রিপ্টের ডিভিশন দেখে বলল, স্যার, ও তো স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী ঠিকই এক্সপ্রেশন দিচ্ছে। তখন আমি স্ক্রিপ্ট দেখতে গিয়ে দেখি, আমার সহকারী অন্য ডায়লগ দিয়ে দিয়েছে।

আরও পড়ুন
বাবা বললেন My dear son reflected glory will spoil you তুমি নিজে থেকে কিছু করো

পরিচালক ও তাঁর নায়িকা। মণিপুরি ছবির পঞ্চাশ বছরের অনুষ্ঠানে দেবকুমার বসুর সঙ্গে ইয়েংখোম রোমা। ‘মাতমগি মণিপুর’-এ ডেবিউ করে পরবর্তীকালে রোমা হয়ে উঠেছিলেন মণিপুরি ছবির জনপ্রিয়তম তারকা

 

ধরো, আমরা বাংলায় বলি, ‘আপনি জল খাবেন?’, অসমিয়াতে ওরা বলবে, ‘খোয়াপানি পিব?’, আর মেইতেই ভাষায় বলবে, ‘ই সিং পিউহ?’ এবার তুমি যদি চলচ্চিত্রের মধ্যে ডুবে থাকো, তখন তো তুমি শুধু ডায়লগটা দেখছ না, তার ভাব, তার অভিব্যক্তি, সেই এক্সপ্রেশন, হাতটা কোথায় রেখেছ, তোমার চোখটা কতখানি গভীরতা পেল, এগুলোও দেখছ। এগুলো যদি ঠিকভাবে দেখতে পারো, তাহলে মুখের ভাষা না জানলেও তুমি চলচ্চিত্রের ভাষা দিয়ে ধরে ফেলতে পারবে যে শট ও.কে নাকি এন.জি।

 

  • আগের প্রশ্নটার সূত্রেই জানতে চাইব যে, সিনেম্যাটোগ্রাফার বা এডিটররা এক্ষেত্রে কীভাবে কাজ করেছিলেন?

আসলে, পুরো ব্যাপারটা আমি তো জানতাম। পুরোটাই আমার মাথার মধ্যে। ফলে আমি যেরকম যেরকম তাদের নির্দেশ দিয়েছিলাম, তারা সেইমতো বুঝে নিয়ে কাজ করেছিল। এডিটিং কলকাতায় হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ যুদ্ধ পুরোদমে চলছে। ব্ল্যাক আউট চলছে। এডিটর ছিলেন মধুসূদন বন্দ্যোপাধ্যায়। আর শ্যাম শর্মা কলকাতায় রয়ে গিয়েছিলেন এডিটিংয়ে সাহায্য করবেন বলে।

আরও পড়ুন
আমাদের এখানে আলোকসজ্জার বিবর্তনের কথা যদি বলতে হয় সেটা একপ্রকার ছেলেখেলা-দীপক মুখোপাধ্যায়

‘বন্ধু, কী খবর বল?’ মণিপুরি ছবি সাম্রাজ্যের বাবর ও আকবর। বকলমে দেবকুমার বসু ও অরিবাম শ্যাম শর্মা

 

  • ‘মাতমগি মণিপুর’-এর পোস্ট প্রোডাকশন যখন চলছে, তখনই সম্ভবত আপনার বাবা চলে যান। আপনি এমন একটা কাজ করছেন, এটা দেখে ওঁর প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

হ্যাঁ, বাবা চলে যান ১৯৭১-এর নভেম্বরে। পোস্ট-প্রোডাকশনের সময়কার ছবি দেখলেই লক্ষ করবে, আমার মুণ্ডিত মস্তক। বাবার মৃত্যুর আধঘণ্টা আগের একটা স্মৃতি তোমায় বলি। তখন তিনি আমার উপর বেশ ক্ষুণ্ণ। আমি বিচিত্র রকমের ছবি করছি। ডকুমেন্টারি, ফিচার ফিল্ম, নিউজরিল, সবরকম। আমার ব্যবসা বাড়ছিল, অনেক রকমের ছবিও হচ্ছিল। আমার নিজেকে বেশ কৃতি মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেটা তো আসলে ভালোবাসা থেকে মনে হয়। বাবা আমাকে বলেছিলেন, তুমি এত কাজ একসঙ্গে করছ কেন? My dear son, try to stand first and then move. কিন্তু আমার শোনার অত সময় নেই। রাসবিহারীতে একটা আলোচনা আছে আমার। সকালে ডকুমেন্টারির কাজ করে এসেছি। সন্ধেয় ফিচার ফিল্ম নিয়ে আলোচনা করব। ওঁরা আগেকার দিনের পরিচালক, একটা ছবিতেই ধ্যানস্থ থাকতেন। এখানে একটু খামচানো, ওখানে একটু খামচানো, এটা পছন্দ ছিল না। তখন বাবা আমাকে বললেন, My dear son, try to create. Don’t manufacture.

আরও পড়ুন
এক্সক্লিউসিভ: মুখোমুখি হান্নান মোল্লা – বাংলার কৃষকরা এই আন্দোলনে নেই এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা

অতিসদ্য মণিপুরি ছবির ৫০ বছর উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত দেবকুমার বসু,  ছবি: দেবাশিস বসু

 

এটা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। মনে হল, আমি কী করছি তাহলে? চলচ্চিত্রে তো একটা ব্যবসার দরকার হয়। কিন্তু সেখানে কতখানি ব্যবসা আর কতখানি ক্রিয়েশন থাকবে, সেটা বোঝার মতো পরিণতবোধ আমার ছিল না। একথা বলার আধঘণ্টা পরেই তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে তিনি লিখেছিলেন – ‘সব মানুষ সমান। জীবজন্তু, পশুপক্ষী সব এক। এ কোনও সামাজিক কথা নয়, অন্তরতম সত্তার কথা। এই আমার ব্রহ্ম উপলব্ধি। কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ।’ এবং লেখার পরেই আমার স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে ঢলে পড়েন।

 

  • মণিপুরি ছবি পঞ্চাশ বছরে পা দিচ্ছে। আপনি একটা যাত্রার শুরুটা করে দিয়েছিলেন, তারপর সেই ভাষায় অসাধারণ কাজ করেছেন আপনার সহকর্মী অরিবাম শ্যাম শর্মা থেকে শুরু করে মাখনমণি মোংসাবা কিংবা হালের হাওবাম পবন কুমার বা রোমি মেইতেই। একসময় আপনার হাত ধরেই এই যাত্রাটা শুরু হয়েছিল, এটা ভাবতে কেমন লাগে?

খুব ভালো লাগে। পথচলাটা শুরু করে দিয়েছিলাম। এখন ওরা যেভাবে কাজ করছে, ওয়ার্ল্ড সিনেমার জায়গায় চলে গেছে। অসাধারণ সব লোকেশন ওখানে। মণিপুরি সমাজে তো মেয়েরাই সব, মেয়েরাই সব কাজ করে। একটা অন্যরকম সমাজব্যবস্থা। সেখানকার মানুষরা নিজেদের কথা যদি তুলে ধরে সিনেমায়, সে তো দারুণ ব্যাপার। ছেলে যদি বড় হয়, বাবার যেরকম আনন্দ হয়, ঠিক সেরকমই আনন্দ লাগে দেখলে। ওরা আজকে কাজ করছে, আমি অবজার্ভার হিসেবে দেখি।

 

অনেক তো পুরস্কার পেয়েছি, জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি, কিন্তু আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার কোনটা জানো? শেষ যখন মণিপুরে গেলাম লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট নিতে, তখন ডায়াসে মন্ত্রীরা সব বসে আছে। আমাকে নিয়ে নানা কথাবার্তা চলছে। আমার স্ত্রী, ছেলে সকলেই আছে, তার মধ্যে একটি অল্পবয়সি মেয়ে দৌড়তে দৌড়তে এসে বলছে, My grandmother wants to take a photograph with you. মেয়েটি ভারী সুন্দর, ঠাকুমার অনুরোধটা ফেলতে পারেনি, তাই মন্ত্রীরা আছে তাও ও চলে এসেছে। সিকিউরিটি ওকে যথারীতি আটকে দিয়েছিল। কিন্তু আমি ওকে আসতে বললাম। তারপর অনুষ্ঠান শেষ হতে আমি ওকে বললাম, চলো, তোমার ঠাকুমার কাছে নিয়ে চলো। সে নিয়ে গেল। দেখলাম তিনি বেশ বৃদ্ধা। আমি তাঁর পাশে বসলাম। ক্যামেরাম্যান যে ছিল, সে ছবি তুলল। সেই বৃদ্ধা বললেন, তোমার সঙ্গে আমার ছবিটা আমার ড্রয়িংরুমে সাজানো থাকবে। তুমি তো আমাদের গডফাদার, তুমিই তো আমাদের সিনেমা শিখিয়েছ।

আরও পড়ুন
প্রজাতন্ত্র দিবস স্পেশাল: কৃষকরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, যদি লড়তেই হয় তবে একজোট হয়ে লড়াই ভালো

২০১৮ সালে করম মনমোহন সিং লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড নিতে মণিপুরে, সস্ত্রীক

 

একজন বৃদ্ধা কত উৎসাহ নিয়ে অতক্ষণ আমার জন্য অপেক্ষা করেছে। এই যে আবেগ, আমার তো মনে হয় এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু নেই, থাকতে পারে না। সিনেমার জন্যই এগুলো পাওয়া। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই আবেগকে আমরা আর সিনেমায় তুলে ধরতে পারি না।

 

  • আপনি আপনার চলচ্চিত্র-জীবনে প্রচুর তথ্যচিত্র বানিয়েছেন, পরবর্তীকালে বেশ কিছু টেলিভিশন ধারাবাহিক, স্বল্প-পরিচিত ভাষায় ফিচার ছবি তৈরি করে একটা ইন্ডাস্ট্রি দাঁড় করিয়েছিলেন, কিন্তু আপনার হাত থেকে সেরকম ব্যাপক অর্থে ফিচার ছবি আমরা পেলাম না কেন?

আমার বাবা মৃত্যুর আগে যে কথা বলে গিয়েছিলেন, আমি জীবনের কিছু সময়ের জন্য এই পরামর্শ থেকে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি একসময়ে নাইজেরিয়ায় চলে যাচ্ছিলাম ফিল্ম কালার ল্যাবরেটরি তৈরি করতে। আমার স্ত্রী আমায় আটকায়। সেই নিয়ে সামান্য মনোমালিন্যও হয়েছিল। তখন আমি স্ত্রীকে না জানিয়েই বোম্বেতে যাই একটা ছবি প্রোডিউস করতে। যে আমি অত ছবি-ডকুমেন্টারি করে প্রচুর রোজগার করেছি, আমার নিজস্ব সরঞ্জাম ছিল, কলকাতায় প্রথম এয়ার কন্ডিশনড এডিটিং স্টুডিও আমার ছিল, সেই আমি মার খেলাম বোম্বেতে। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে যে ছবিটা করলাম, ‘ঝুটি শান’ নামে, সেটা সুপারফ্লপ হল।

আরও পড়ুন
ভিন্নসময় এক্সক্লুসিভ: ‘২৬ জানুয়ারি যা ঘটেছে তা পুরোপুরি ষড়যন্ত্র ছিল’– কৃষক নেতা রামিন্দর সিং পাটিয়ালা

‘দ্বিতীয় হুগলী সেতু’ তথ্যচিত্রের শুটিং চলছে। এই তথ্যচিত্রটি দেবকুমার বসু ও তাঁর দল বানিয়েছিলেন ২৫ বছর ধরে

 

ছবিটা পরিচালনা করেছিলেন আমার জ্যাঠতুতো দাদা রঞ্জন বসু, তাঁরই গল্প এবং চিত্রনাট্য। তিনি আমায় বলেছিলেন, তুমি জাতীয় পুরস্কার পাওয়া পরিচালক, তুমি পরিচালনা করছ না কেন? কিন্তু আমি তো বোম্বেতে গিয়ে ফেঁসে গিয়েছিলাম। ওখানকার ডিস্ট্রিবিউটররা বলেছিল যে, আপনাদের ওই আর্ট ফিল্ম এখানে চলবে না। আমি যে গল্পটা দিয়েছিলাম, ওরা দেখে বলেছিল, এটা খুবই ভালো, কিন্তু এতে মশলা কই? মশলা আবার কী, আমি তো সেসব বুঝি না। সেজন্যেই দাদাকে বলেছিলাম পরিচালনা করতে, আমি প্রযোজনা করেছিলাম। আসলে, আমি ওদের ফর্মটা বুঝতে পারিনি। ওখানে ছবি ম্যানুফাকচার হত। এখন বোম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি অনেক ভালো। সত্যজিৎবাবু থাকলে এটা ভালো বলতে পারতেন। ওই ১২ রিল খোলে, আবার ১০ রিল প্যাঁচায়, এইভাবে কাজ হত।

 

ছবিটায় মিঠুন চক্রবর্তী, শাবানা আজমি ছিলেন। মিউজিক করেছিলেন আর. ডি. বর্মণ। আমি বোধহয় কোথাও বাবার ওই ক্রিয়েট-ম্যানুফ্যাকচারের পরামর্শটাকে ছাপিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। আমি নানা ভাষায় ছবি করেছি। আমি ওড়িয়া ভাষাতেও ছবি করেছি। বিভিন্ন রাজ্য সরকারের এনলিস্টেড ফিল্মমেকার ছিলাম আমি। ওড়িশা সরকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হয়ে কাজ করেছি। অত কিছু করে বোম্বেতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে, প্রচুর টাকা নষ্ট করে ফিরলাম। কিছুদিন পরে এক মারোয়াড়ি ভদ্রলোক এসে বলেন, আপনি আবার বোম্বেতে চলুন। আপনি ফাঁকফোকরগুলো তো বুঝে গেছেন। সেইমতো বুঝে কাজ করুন, যা টাকা লাগবে আমি দেব। আমি তাঁকে বলি, রক্ষে করো বাবা। আর আমি গাড্ডায় পড়তে চাই না। আমি বোম্বেতে গিয়ে ফেল করেছি। উত্তমবাবুও বোম্বেতে গিয়ে ফেল করেছিলেন। জেনেশুনে আর ওই জায়গায় যেতে চাই না।

আরও পড়ুন
‘ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত দেশগুলোর মানুষজন পরস্পর মুখোমুখি হলে আসলে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়’- আকিল কুমারাসামি

ছবিতে (বাঁদিক থেকে) দেবকুমার বসু, পিডব্লিউডি মন্ত্রী ভোলা সেন, বি. আর. চোপড়া, ‘ঝুটি শান’ ছবির পরিচালক রঞ্জন বসু, ছবির দুই অভিনেতা-অভিনেত্রী কানওয়ালজিৎ সিং ও শাবানা আজমী, শক্তি সামন্ত ও বাসু চট্টোপাধ্যায়

 

বোম্বে থেকে ফিরে আমার ইচ্ছে ছিল, এবার বাংলায় বেশ কিছু ফিচার ছবি করব। একটা ছবি করলাম, নাম ছিল ‘অনুভব’। মমতাশঙ্কর, দীপঙ্কর দে-রা অভিনয় করেছিলেন। বেশ ভালো হয়েছিল ছবিটা। কিন্তু ডিস্ট্রিবিউটর টাকা মেরে দিল। তখন আমার খুব অভিমান হল। কারণ আমি তো প্রোডিউসারের কথায় ছবি করতাম না, নিজের ছবি করতাম। আমি দেখলাম, এরকম যদি হয়, তার চেয়ে ভালো আমি দূরদর্শনের জন্য ‘বিবাহ অভিযান’ করব। আমি নিজে তখন স্টুডিও করলাম। আমি সবসময়ে নিজের সরঞ্জাম নিয়েই কাজ করতাম। আবেগপ্রবণ হলেও ব্যবসায়ী বুদ্ধিটা হয়তো ভালোই ছিল, তাই আমি নিজস্ব ক্যামেরা, নিজস্ব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতাম। আমি মনে করি, একজন শিল্পীর যেমন ছবি আঁকার জন্য তুলি দরকার, তেমন একজন ফিল্মমেকারেরও নিজস্ব মুভি ক্যামেরা থাকলে ভালো হয়। হয়তো একটা সুন্দর শটের ভাবনা মাথায় এল, কিন্তু তখনই ক্যামেরা ছেড়ে দিতে হবে, এটা আমার পছন্দ ছিল না। ওভারটাইম দিতে অসুবিধা নেই, কিন্তু সুন্দর মুহূর্তটাকে নষ্ট করতে দেব কেন! এই নিয়মকানুনের মধ্যে থাকলে সেই মনটা নষ্ট হয়ে যায়। তাই সেই সময়ে আমি ফিচার ফিল্ম ছেড়ে টিভি সিরিয়াল করলাম। তার মধ্যে ‘বিবাহ অভিযান’ তো ল্যান্ডমার্ক হয়ে গেল।

 

  • ‘বিবাহ অভিযান’ নিয়েই পরবর্তী প্রশ্ন আমার। সিরিয়ালটা কেবলমাত্র সিরিয়াল ছিল না, একটা আবেগে পরিণত হয়েছিল। নির্মাণটাও খুব সুন্দর ছিল। আমার প্রশ্ন, ফিল্ম থেকে টেলিভিশন, বড় পর্দা থেকে ছোট পর্দায় এই যে পরিবর্তন, সেটাকে কীভাবে সামলেছিলেন?

তুমি যদি সৃষ্টিশীলতার দিক থেকে দ্যাখো, তাহলে বড় পর্দা কি ছোট পর্দা, কোনও গুরুতর ব্যাপারই নয়। তুমি যদি জমাতে পারো, তুমি যদি শিল্পের মধ্যে ধ্যানস্থ হয়ে গিয়ে তোমার বক্তব্যটা প্রকাশ করতে পারো, তাহলে সেটা ফিল্ম বা টেলিভিশন যেকোনো মাধ্যমেই ভালো হবে। সিরিয়ালের ক্ষেত্রে খুব বেশি লং শট হয়তো তুমি নিলে না, কারণ ছোট পর্দায় ক্লোজ ট্রিটমেন্ট মানুষ বেশি পছন্দ করে যাতে বিষয়টা হারিয়ে না যায়। কিন্তু সেসব সত্যিই কোনও ম্যাটার করে না। আমি ‘বিবাহ অভিযান’-এর ক্ষেত্রে লং শট তো নিয়েছি।

 

ওরা ওই পুকুরঘাটে দৌড়চ্ছে, পুকুরে পড়ে যাচ্ছে, এসব শট নিয়েছি, লোকে হই-হই করে সেগুলো দেখেছে। ফিচারের মতো করেই আমি সেই দৃশ্যগুলো তুলেছিলাম। কানাই দে ক্যামেরাম্যান ছিলেন, অসাধারণ ক্যামেরাম্যান। ডে ফর নাইটে (Day for night; ফিল্ম শুটিংয়ের একটি বিশেষ পদ্ধতি, যেখানে দিনের আলো থাকতে থাকতেই রাতের দৃশ্য তৈরি করে ফিল্ম শুট করা হয়) শুট করেছিলেন। এছাড়া ধরো, লেন্সের ব্যাপার থাকে। আমি ৫০ মিমি লেন্সেই কাজ করতে পছন্দ করতাম। জুমটা আমার অতটা ভালো লাগত না। ঋত্বিক ঘটক যেমন ৮০ মিমি লেন্সে শুট করা পছন্দ করতেন, সত্যজিৎবাবু ৩৫ মিমি-তে কাজ করতে পছন্দ করতেন। মূল ব্যাপার হচ্ছে, তুমি যেটা চোখের সামনে দেখছ, সেটাই তুমি পর্দায় দেখাবে।

আরও পড়ুন
‘আমরা যতই এলেবেলে হই, আমাদের বিজ্ঞানটা যেন কখনোই এলেবেলে না হয়ে যায়’

গঙ্গার ধারে ছয় বন্ধুর আড্ডা, ‘বিবাহ অভিযান’ যেভাবে শুরু হত। শুটিং হয়েছিল ফলতার গঙ্গাতীরে,ছবি:দূরদর্শন ইউটিউব চ্যানেল

 

  • ‘বিবাহ অভিযান’ টেলিভিশনে সম্প্রচারের চল্লিশ বছর আগে ওই একই গল্প নিয়ে একটা অসাধারণ ছবি সুপারহিট হয়েছিল, ‘বরযাত্রী’। কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপকুমার, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো একঝাঁক অভিনেতা উঠে এসে পরে কিংবদন্তি হয়ে যান। আপনি যখন ‘বিবাহ অভিযান’ করতে যাচ্ছেন, তখন কোথাও গিয়ে ‘বরযাত্রী’-র জনপ্রিয়তা নিয়ে কি আশঙ্কা ছিল?

এটাও খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। এটা নিয়ে আমাকে অনেকেই তখন বলেছিল যে, এরকম সুপারহিট একটা ছবি অলরেডি হয়েছে, কালী ব্যানার্জি করেছেন। তুমি আবার এটা নিয়ে করবে? আমি তখন উত্তর দিয়েছিলাম, আমি একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে করব। শঙ্করকে (চক্রবর্তী) বলেছিলাম, তুমি যদি কালী ব্যানার্জির অভিনয় দেখে থাকো, তাহলে সেটা ভুলে যাও। তুমি নতুন করে করবে। তারপর যেটা হল, যারা আমায় অনুরোধ করেছিল যে, এটা কোরো না, তারাই পরে সেটা দেখে এত আনন্দ পেয়েছিল যে বলে, তুমি এটা না করলে আমাদের দেখা হত না। মানে, যারা একসময় উৎকণ্ঠিত হয়েছিল, তারাই পরে উৎফুল্ল হয়ে উঠল।

 

‘বিবাহ অভিযান’ নিয়ে প্রচুর গল্প আছে। একজন ভদ্রমহিলা ফোন করে আমাকে বলেন, আমার মা অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেছেন, তিনি ‘বিবাহ অভিযান’-এর ক্যাসেট পেতে চাইছেন। আমার মাসিদের সঙ্গে বসে আমরা দেখতাম। দেখতে দেখতে হাসতে হাসতে আমরা একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়তাম। আমার সেই মাসি মারা গেছেন, মা ‘বিবাহ অভিযান’ দেখে সেই হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো ফিরে পেতে চাইছেন। এমনও হয়েছে, আমি এয়ারপোর্টে গেছি, যেতে দেরি হয়েছে, নিয়মের ফাঁসে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। তারপর যেই মুহূর্তে জানতে পারল, আমি ‘বিবাহ অভিযান’-এর ডিরেক্টর, তখনই নিজেরাই সিনগুলো মনে করে হাসিতে ফেটে পড়েছে। তারপর যারা বাধার সৃষ্টি করছিল, তারাই চটপট কাজ করে দিয়েছে।

 

  • সিরিয়ালে ছ’টি প্রধান চরিত্র। যদিও কেন্দ্রীয় চরিত্র গণশা, কিন্তু ছ’জনই বলতে গেলে সমান পরিসর পেয়েছে। ছ’জনকেই সমান পরিসর দেওয়া, এই কাজটা করতে আপনার নিজস্ব ভাবনা কী ছিল?

সবকটা নতুন ছেলে। ওদের মধ্যে শুভাশিস তার আগে কিছু কাজ করেছিল। বাকি সব শঙ্কর-রঞ্জন-রাহুল এরা সবাই নতুন। আমি ওদের বললাম, তোরা এক কাজ কর। আমার বাড়ির সামনেই লেক। তোরা ওই লেকের ধারে বাদাম কিনে খেতে খেতে নিজেদের মধ্যে গল্প কর। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি কর। অভিনয় নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না, সেটা আমি করিয়ে নেব। তোরা শুধু নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্বটা তৈরি করে ফ্যাল, আমি ওটাই ধরে নেব। এবার এই যে বোঝাপড়ার ব্যাপারটা, এটাকে আলাদা করে দেখলে হবে না। সমষ্টিগত ভাবে দেখতে হবে। পাড়ার রোয়াকে বসে যারা আড্ডা মারে, তাদের তো তুমি নিশ্চয় দেখেছ। ওরা যখন আড্ডা মারে, তখন ওরাও একটা সমষ্টি হয়ে যায়। এ ওর পিঠ চাপড়াচ্ছে, এ ওকে সিগারেট ধরিয়ে দিচ্ছে, খণ্ড খণ্ড মানুষগুলো একত্রে হয়ে যাচ্ছে। আমি সেভাবেই এদের সকলকে এক হিসেবে দেখেছিলাম। কাউকে আলাদা করে প্রেফারেন্স দিইনি। চরিত্র অনুযায়ী প্রেফারেন্স দিয়েছিলাম।

 

সবকিছু একসঙ্গেই হবে। গনশার বিয়ের জন্য ওরা যে ছুটছে, ওরা কিন্তু মনেপ্রাণেই গনশার বিয়ের জন্য ছুটছে। তার জন্য মামার কাছে বকুনি খাচ্ছে, আরও কত না বিপদে পড়ছে। ওই পুকুরে ঝাঁপ দেওয়ার যে দৃশ্যটা ছিল, ওটা নিয়ে আমার খেয়ালই নেই যে, অত ঠাণ্ডার মধ্যে পুকুরে নামলে ওরা মারা পড়বে (হাসি)। ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে, আর আমি পিছন থেকে চেঁচাচ্ছি, লাফা। আসলে ডিরেকশন দেওয়ার একটা ভঙ্গিমা থাকে। যদি সেটা খুব ইন্সপায়ারিং হয়, তাহলে অভিনেতা খুব জোর পায়। ওই যে চেঁচিয়ে ‘জাম্প’ বলতাম, তাতেই ওরা চাঙ্গা হয়ে যেত। সকলে এই যে একসঙ্গে বিপদে পড়ল, তারপর তারা একসঙ্গেই বিপদ থেকে বাঁচার জন্য পরিকল্পনা করছে।

আরও পড়ুন
অপারেশনের সময়ে হাতিটির আক্রমণে আমার শ্যালক নিহত হন, তারপরেও আমি ওদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি

‘বিবাহ অভিযান’ সিরিয়ালের একটি মজার দৃশ্য, ছবি:দূরদর্শন ইউটিউব চ্যানেল

 

তবে ছেলেগুলো ঘাম ঝরিয়ে কাজ করেছিল। অনেক ক্ষেত্রেই হয়েছে, আমি ‘কাট’ বলতে ভুলে গেছি, ওরা এমন মজাদার অভিনয় করেছে। একটা দৃশ্য ছিল, পানের পিক ফেলবে, তারপরে ওরা একে অন্যের ঘাড়ে গিয়ে পড়বে। সেটা ট্রলি শট ছিল। এটা জানো হয়তো যে, ‘বিবাহ অভিযান’-এ প্রচুর ট্রলি শট ছিল। এবার আমি দেখছি, ক্যামেরার ওপরে কানাইয়ের মাথা নড়ছে। কানাই খুক খুক করে হাসি চাপার চেষ্টা করছে। আমি কানাইয়ের দিকে রেগে তাকিয়েছি, কিন্তু কানাইয়ের ওরকম কাণ্ড দেখে আমার নিজেরই হাসি পেয়ে গেছে। তারপরে শটের যতটা ছিল, হয়ে গেছে, ওরা এবার বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে ক্যামেরা চলছে তখনও। তারপর হুঁশ ফিরতে আমি বলছি, ‘কাট কাট কাট’। তখন ওরা হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। একটা সিরিয়াল দেখে লোকে যেমন আনন্দ পেয়েছিল, সেটা করতে গিয়ে টেকনিশিয়ানরা, অভিনেতারা সকলে আনন্দ পেয়েছিল। হুটোপাটি করে কাজ হয়েছিল।

 

  • সিরিয়ালের শুটিং কোথায় কোথায় হয়েছিল?

শুটিং নানা জায়গায় হয়েছিল। বোড়ালে, জয়নগরে। ফলতায় গঙ্গার ধারে কিছু দৃশ্য তোলা হয়েছিল।

 

  • ফিল্মমেকিংয়ের পাশাপাশি আপনি সামাজিক নানা কাজেকর্মেও নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন। এটা কি চলচ্চিত্র পরিচালনা থেকে ছুটি নেওয়ার পর?

একদম। আমি কাজ না করে থাকতে পারি না। আমার বাবা, যিনি কিনা ছিলেন ‘চলচ্চিত্র-সন্ন্যাসী’, তিনি ষাট বছর বয়সে জীবনকে ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন সত্যের সন্ধানে। সেই বাবাই আমার ভেতরে এমন বীজ বপন করে দিয়েছিলেন যে, সেটার মধ্যে থেকে বেরোতে পারলাম না। লেক টেম্পল রোডে শিবমন্দির আছে, নিশ্চয় জানো। সকলে বলে খুব জাগ্রত মন্দির, পুজো দেয় সকলে। একটা ট্রাস্ট আছে, সেখানে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আছে। আমাকে ওখানে নিয়ে যাওয়া হল। আমি কিছু কিছু কবিতা লিখলাম, সাপুড়ে মূর্তি তৈরি করালাম।

 

তারপরে আমার মনে হল, এটা কী করছি? মূর্তির পুজো করছি কেন? বিবেকানন্দ যেমন বলেছিলেন যে, জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর, আমি তেমন ভাবলাম, আমি যদি ওখানকার বস্তির ছেলেদের জন্য কিছু করতে পারি। আমি এখন ওখানকার প্রেসিডেন্ট। ওখানে একশোজন বস্তির ছেলে নানা কাজকর্ম শেখে। এখন করোনা, লকডাউন এসবের কারণে সংখ্যা কমে গেছে। আমি ওদের স্বাস্থ্য, নাচ, আঁকার ক্লাস শুরু করা, এবং তাদের মায়েদের মানসিকভাবে একটা ভালো জীবনধারার মধ্যে আনার কাজ শুরু করলাম। ওরা হয়তো গালাগালি দেয়, অসভ্যতা করে, কিন্তু সেটা ওদের বাইরের রূপ। আসলে তো ওদের মধ্যে একটা সুন্দর হৃদয় আছে। সেই হৃদয়টাকে আমি যদি বার করে আনতে পারি, সেটাও একটা চলচ্চিত্র।

আরও পড়ুন
সেদিন তার চোখে যে ভাষা দেখেছিলাম, একজন ডাক্তারের কাছে তার চেয়ে বড় পারিশ্রমিক আর কিছু হতে পারে না।

টাউন হলে আয়োজিত একটি সভায় বক্তব্য রাখছেন সমাজকর্মী হিসেবে, ছবি: দেবাশিস বসু

আমি ভীষণভাবেই এই কাজটার মধ্যে ডুবে থাকি। আমার যত যা রোজগার, সঞ্চয়, সবটাই এখানে দিয়ে দিয়েছি। আসলে এটা বাবাই আমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। আমি হয়তো বাবার থেকে পালিয়ে গিয়ে অসম, মণিপুরে ছবি করেছি, কিন্তু বাবার প্রভাব থেকে কোনোদিনই বেরোতে পারিনি। উনি ওই যে ‘চণ্ডীদাস’-এর মাধ্যমে বলিয়েছিলেন, সবার উপরে মানুষ সত্য, আমিও সেই মানুষকেই খুঁজে বেড়িয়েছি। এই শিবমন্দিরের এখানে আমি যে কাজ করছি, সেটাও একটা দারুণ চলচ্চিত্র। এখানে আমার শিল্পী ওই বস্তির ছেলেমেয়েরা, তাদের মায়েরা। মানুষের প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা, তার যে প্রকাশভঙ্গি, আমার স্ত্রীর মধ্যে আমি সেই জিনিস দেখেছি, কিন্তু সেই প্রকাশভঙ্গি আমি সিনেমায় তুলে ধরতে পারিনি। আমি ব্যর্থ হয়েছি।

 

আসলে এই মানুষ এবং জীবন নিয়ে যে ভাবনা, আমার বাবা এই ভাবনা সর্বক্ষণ ভেবে গেছেন। উনি বেনারসে গিয়েছিলেন মানুষের সন্ধানে। বোম্বেতে যখন যেতেন জিড্ডু কৃষ্ণমূর্তির সঙ্গে কথা বলতে, তখন সেই জীবন নিয়ে কথা বলতেন। ওঁর ঘরে কার্দার (অভিনেতা আব্দুর রশিদ কার্দার), মেহবুব খান, নার্গিস, কামিনী কৌশল, যাঁরাই দেখা করতে আসতেন, তাঁদের উনি বলতেন, No more filmy talks, Talk about life only. উনি বিরাট জমিদার বংশের ছেলে ছিলেন, সেকথা তো বললাম। ওই বাড়ির সামনে দিয়ে লোক গেলেই ভেতর থেকে চেঁচিয়ে উঠত, কে যায়? বাবা এই প্রথার প্রতিবাদ করতেন। তিনি সবসময় বলতেন, মানুষ যায়। বাবা এভাবে বারবার মানুষের কথা বলে গেছেন। এজন্য বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনে তিনি যোগ দিয়েছেন, বর্ধমান শহরের রাস্তায় বসে খড় বিক্রি করেছেন, গামছা-তোয়ালে বিক্রি করেছেন। ‘শক্তি’ পত্রিকায় ব্রিটিশ-বিরোধী প্রবন্ধ লিখতেন। ডিজি-র (ধীরেন গাঙ্গুলি) চোখে পড়ে সেই লেখা। উনি বাবাকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি চলচ্চিত্রে লিখবেন? সেইভাবে বাবার চলচ্চিত্রে আসা এবং জয় করা। প্রচুর টাকা করেছিলেন, কিন্তু মানুষের কথা বলে গেছেন চিরকাল।

আরও পড়ুন
গান শোনার অভ্যাস থেকেই আমি ভাবলাম, সঙ্গীতকে আমি যদি ছবিতে আনতে পারি- সমীর আচার্য

আজীবন বন্ধু ছিলেন স্ত্রী শিপ্রা বসু। নৈনিতালে তোলা যুগলের ছবি

 

  • ছবিনির্মাণের ক্ষেত্রে সেই সময়ের কোনও বিদেশি ছবি বা চিত্রনির্মাতার দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন?

ইতালীয়-আমেরিকান পরিচালক ফ্র্যাঙ্ক কাপরা আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছিলেন। চলচ্চিত্র কীরকম হওয়া উচিত, সেই ব্যাপারে বলতে গিয়ে উনি এক জায়গায় লিখছেন, সিনেমা হলে ঢোকার সময় এক ভিখারি আমার কাছে হাত পেতেছে, সে বলছে ‘Give me money, give me money.’ আমি তাকে এড়িয়ে সিনেমা হলে ঢুকে গেলাম। সিনেমাটা দেখলাম। তারপর হল থেকে বেরোনোর সময়ে আবার সেই ভিখারি আমার সামনে এসে বলল ‘Give me money.’ এবার আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। আপনা থেকেই আমার হাত পকেটে ঢুকে গেল। একটা ডলার বার করে তার হাতে দিলাম। এই যে আমার মধ্যে একটা উত্তরণ হল বিনোদনের মাধ্যমে, এটাই তো চলচ্চিত্র। কী অসাধারণ কথা, ভাবো। এটাই তো জীবন, এটাই তো ভালোবাসা। চলচ্চিত্র যেন সেই জীবনকে ধরতে পারে।

 

  • বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তখন যেরকম ছিল, এখন সেরকম আছে?

একটা কথা বলি। ক্ষতিকারক প্রোডিউসাররা এসে সর্বনাশ করছে। পরিচালককে যতটা সৃষ্টিশীল হতে হয়, প্রযোজককেও ততটাই শিল্পের দিকটা বুঝতে হবে। বি. এন. সরকার (বীরেন্দ্রনাথ সরকার, নিউ থিয়েটার্সের প্রতিষ্ঠাতা) দেবকী বসুকে পেয়েছিলেন। যখন শুটিং চলত, উনি স্টুডিওতে প্রবেশ করতেন না। একদিন বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, দেখলেন দুটো লোক ফ্লোরের বাইরে কথা বলছে। তাদেরকে গিয়ে বললেন, শশশ। ডিরেক্টর কাজ করছে। আর এখন একজন প্রযোজক এসে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে লাঞ্চের বিল বলে। বোঝেও না যে, ডিরেক্টরের ভাবনা কতখানি ঘেঁটে যায় এসবের জন্য।

 

একবার হাইওয়ে ধরে যাচ্ছি গাড়িতে করে। হঠাৎ দেখি, শুটিং চলছে। ডিরেকশন দিচ্ছে আমারই সহকারী জয়ন্ত। জয়ন্ত পুরকায়স্থ, ও খুব ভালো কাজ করেছিল, মারা গেছে এখন। আমি আমার গাড়ির চালককে বললাম, থামাও তো। তারপর ওদের কাছে গেলাম। সকলে আমাকে চেনে। যেতেই ‘স্যার, স্যার’ করে এগিয়ে এল। ওরা অবশ্য তখন দেখি দাঁড়িয়ে আছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তোরা সময় নষ্ট করছিস কেন? ওরা বলল, প্রোডাকশন ম্যানেজারকে চা আনতে পাঠিয়েছে। সে চা নিয়ে এলেই সেটা পান করে আবার শুটিং শুরু হবে। বেশিরভাগ প্রোডাকশন ম্যানেজারগুলোকে দেখেছি প্রোডাকশন ড্যামেজার হয়। সে অনেকক্ষণ গেছে, নিশ্চয় কোথাও গল্প জুড়েছে। আমি দেখলাম, দূরে একটা গাছের নিচে একজন চা বিক্রি করছে। সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। সকলের জন্য কেটলিতে চা আর ভাঁড় নিয়ে এলাম। ওরা তো রীতিমতো অপ্রস্তুত। একি স্যার, আপনি কেন চা আনবেন? আমি বললাম, সঙ্কোচ করছিস কেন? আমরা তো সবাই একই পরিবার রে। আমি চা এনেছি, তাতে ওদের কী সঙ্কোচ। আমি ওদের বললাম, হ্যাঁ রে, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিটা এরকম থাকবে তো? বলতে বলতে আমার চোখ থেকে একফোঁটা জল চায়ের মধ্যে পড়ল।

আরও পড়ুন
জাতপাতকে এত স্বাভাবিক ঘটনা বলে আমাদের শেখানো হয়েছে যে, আমরা সেভাবে এটা নিয়ে কথা বলিনি

ক্যামেরায় লুক-থ্রু।

এখন যে ভালো কাজ হচ্ছে না, তা নয়। অবশ্যই কয়েকজন ভালো কাজ করছে। খারাপ কাজ আমাদের সময়েও হয়েছে। খারাপ প্রোডিউসার তখনও ছিল। আমার নিজেরই তো সেই অভিজ্ঞতা আছে। যে কারণে আমি সহজে অন্য প্রোডিউসারের কাজ করতাম না। কিন্তু এই যে পরিবারের মতো একটা ভাবনা ছিল, এটা অনেক কমে গেছে এখন।

(সমাপ্ত)

তথ্য সহায়তায়: সোমেশ ভট্টাচার্য, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
ছবি সৌজন্যে: দেবাশিস বসু

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,820FansLike
20FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!