১৩ জুন, ২০২১রবিবার

১৩ জুন, ২০২১রবিবার

স্মরণ:বিদায়বেলাতেও নজির রেখে গেলেন মরণোত্তর দেহদান-অঙ্গদান আন্দোলনের পুরোধা ব্রজ রায়

তাঁর মৃত্যুর পরেও এক নজির সৃষ্টি হল! সেখানে অবশ্য প্রত্যক্ষভাবে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু জীবনকালের প্রায় অর্ধেক সময় যা-কিছু করেছেন, যে-ভাবনায় কাটিয়েছেন, দীর্ঘদিনের সেই যাপনকে সম্মান জানিয়ে, তাঁর মর্যাদা রক্ষা করেই কোভিড আক্রান্ত মরদেহেও চলল বিশেষ রকমের ময়নাতদন্ত। সৃষ্টি হল নজির। কেবল এ রাজ্যেই নয়, সারাদেশেও প্রথম, হয়তো এই উপমহাদেশেও। চিকিৎসাশাস্ত্রের দিক থেকে তার গুরুত্ব অপরিসীম।   

হ্যাঁ, ভবানীপুরের বাসিন্দা অশীতিপর ব্রজ রায়ের কথা হচ্ছে। খবরে প্রকাশ, দীর্ঘদিনের কিডনির অসুখ ছাড়াও বয়েসজনিত আরও কিছু সমস্যা ছিল অকৃতদার মানুষটির। এই মে মাসেই গত ৬ তারিখে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তাঁরই হাতে-গড়া সংগঠন ‘গণদর্পণ’এর কর্মীরা মিলে ভর্তি করেন তাঁকে শেঠ সুখলাল কারনানি মেমোরিয়াল (এসএসকেএম) হাসপাতালে। কিন্তু দিন দু-তিনেকের ভেতর তাঁর শরীরে কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়তেই শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে সরানো হয়। সেখানেই  ১৩ মে, গত বৃহস্পতিবার সকাল দশটা চল্লিশ নাগাদ তিনি প্রয়াত হয়েছেন।

আরও পড়ুন
শুধু করোনায় নয় মাস্ক পরার প্রচলন ছিল আজ থেকে ৩ হাজার বছর আগেও
   

বলতে গেলে জীবনের প্রায় অর্ধেকই ব্যয় করেছিলেন মরণোত্তর দেহদান, অঙ্গদান আন্দোলনে পুরোধার ভূমিকায়। কিন্তু সংক্রমিতের দেহগ্রহণ সম্ভব না হলেও, অন্য কারণে তার ‘ব্যবহার’ হল। চিকিৎসাশাস্ত্রের দিক থেকে তার মূল্য অনেক। কোভিড বীজাণু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কোথায় কীভাবে কতটা বিকার ঘটায়, তা আরও বিশদ অনুপুঙ্খে জানতেই ‘প্যাথোলজিকাল অটোপসি’ করা হয় তাঁর মরদেহে। সাধারণ ময়নাতদন্তের চেয়ে আরও গভীর, বিশিষ্ট নির্ণয় বলা চলে। তাঁর আত্মজ ‘গণদর্পণ’এর সদস্যদের অনুরোধে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের অনুমতি পাওয়াতেই তা সম্ভব হয়েছে। এতে বিগতের উদ্দেশেও যথাযথ সম্মান জ্ঞাপন করা হল জীবিতকালে তাঁর কৃতকর্মের গুরুত্ব বিবেচনা করে।    

মৃত্যুর পরদিন, অর্থাৎ  ১৪ মে গত শুক্রবার কোভিড আক্রান্ত তাঁর মরদেহ পরীক্ষা করা হয়েছে রাধাগোবিন্দ কর (আরজি কর) মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে। তিন সদস্যের চিকিৎসক দলের প্রধান ছিলেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ সোমনাথ দাস। কোভিড আক্রান্ত মানবদেহের অটোপসি এই রাজ্যে শুধু নয়, সারাদেশেও, এমনকী এই উপমাহাদেশেও হয়তো প্রথম। চিকিৎসক দলের প্রতিবেদন প্রকাশের পরই হয়তো এক্ষেত্রে আরও নতুন আলো এসে পড়বে, নতুন ভাবনার দরজাও খুলে যাবে। মৃত্যুর পরেও তাই একইভাবে স্মরণীয় হয়ে রইল ব্রজ রায় নামটি। 

আরও পড়ুন
নেপোলিয়ানের স্মৃতিসৌধের উপরই জায়গা হল তাঁর প্রিয় ঘোড়ার কঙ্কালও, অদ্ভুত এই কাণ্ডে খেপল জনতা

আজীবন বামপন্থী ভাবধারার মানুষ ছিলেন। আন্দোলনের জেরে চাকরি খোয়ানো ছাড়াও একদা জেলও খেটেছেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে যুক্ত বিপ্লবী অনন্ত সিংহের (১৯০৩-৭৯) ঘনিষ্ঠ অনুগামীও হয়েছিলেন। স্বাধীনোত্তর কালে,  গত শতকের ছয়ের দশকে অনন্ত সিংহ গড়ে তোলেন তাঁর সংগঠন ‘ম্যান-মানি-গান’ (এমএমজি), যা পরে রেভলিউশনারি কমিউনিস্ট কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (আরসিসিআই) নামে পরিচিত হয়। ব্রজবাবু তার সক্রিয় সদস্য ছিলেন। দলের অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যাংক ডাকাতির ক্ষেত্রে অনন্ত সিংহের সক্রিয়তা সে-সময় খুবই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। তখনকার সংবাদপত্রেও তার অনেক নমুনা ছড়িয়ে আছে। ১৯৬৯-এ অনন্ত সিংহ ও তাঁর সঙ্গীরা সিংভূমের যদুগোরার জঙ্গলে তাঁদের গোপন আস্তানা থেকে ধরা পড়ে জেলবন্দি হন। দলের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে অন্যান্যদের মতো ব্রজবাবুও জেল থেকে ছাড়া পান ১৯৭৭-এ, বামফ্রন্ট সরকার এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর।           

ওই বছরই ব্রজ রায়ের অন্যধারার কাজের সূচনা, ‘গণদর্পণ’এর প্রতিষ্ঠা। বন্দুকের নল আর ক্ষমতার উৎস নয় তখন। রাজ্যের বিভিন্ন দিকে দূর-দূরান্তে রক্তদান কর্মসূচির পক্ষেও প্রচার গড়ে তোলেন। পরিবর্তনের অন্য ভাবনায় সে-সময় ভাবিত তিনি। গণসংগঠন গড়ে তার সামাজিক কর্মধারায় লিপ্ত। ক্রমে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি বা এপিডিআর-এর সঙ্গেও যুক্ত হন। ১৯৮৫ সালের ৫ নভেম্বরে বিজ্ঞানী জেবিএস হ্যালডেন (১৮৯২-১৯৬৪, জন্মসূত্রে ব্রিটিশ কিন্তু পরে ভারতের নাগরিক এবং এদেশেই ভুবনেশ্বরে প্রয়াত)–এর জন্মদিনে সূচনা করেন তাঁর বহুপ্রচারিত মরণোত্তর দেহদান আন্দোলন। অঙ্গীকার করেন প্রথমে চৌত্রিশ জন সঙ্গীকে নিয়ে। যত দিন যায় ক্রমে সেই সংখ্যাটাও বাড়তে থাকে। তাঁর এই অভিনব আন্দোলনে শামিল হন অনেকেই। ভাঙে বহুযুগলালিত সংস্কার।  

আরও পড়ুন
এক গ্রন্থাগারিক প্রথম পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ করেছিলেন

ঘুরে ঘুরে শহরের বিভিন্ন এলাকায়, গ্রামগঞ্জে সভায় বক্তব্য রাখতে থাকেন। তাঁর সংগঠনের মুখপত্র ‘গণদর্পণ’এর মাধ্যমেও চলতে থাকে প্রচারাভিযান। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ সূত্রে জানা যায়, সময় বিশেষে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চ আর ‘গণদর্পণ’এর কর্মসূচিও পাশাপাশি চলেছে। গ্রামগঞ্জের মানুষের ভেতর মরণোত্তর দেহদান, চক্ষুদানের ব্যাপারে আগ্রহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ব্রজবাবু অবিরত প্রচার করে গেছেন। সেই প্রচার হয়তো আকৃষ্ট করেছিল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, সিপিএম-এর প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাস প্রমুখর মতো স্বনামধন্য ব্যক্তিকে। তাঁরা দেহদান করে গেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বার্থেই। 

মরণোত্তর দেহদান তো কেবল হবু চিকিৎসকদের কাজের জন্যই নয়। তার পরিধির বিস্তার ঘটে গেছে অনেকখানি, এদেশেও অনেকদিন। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন। মস্তিষ্কের মৃত্যুর পর প্রত্যঙ্গ বিশেষ গ্রিন করিডোর করে আনা হলে, পরের দিন তার খবর ছবি-সহ কাগজে ছাপা হয়, দেখানো হয় দূরদর্শনে, কত সাধুবাদ দেওয়া হয়  দাতাদের, চিকিৎসকদের, লেখা হয় নিবন্ধ। মৃত্যুর কোলাহলে অমরতার ছোঁয়া দেখে আশ্চর্য হয় লোকে। আর এই সবের পেছনে যে রয়ে গেছে ১৯৯৪ সালে পাশ-হওয়া ভারত সরকারের আইনটি, তা লাগুর পেছনে ব্রজবাবুর ভূমিকাও যে কিছু কম ছিল না, অনেকেরই তা জানা নেই। তাঁর প্রয়াণই সেটা মনে করাল। মনে পড়িয়ে দিল—  ‘জন্মিলে মরিতে হবে, জানে তো সবাই।’ কিন্তু ‘মরণে মরণে অনেক ফারাক আছে ভাই।’ কলিটা ফিরে আসে বার বার, মনে পড়ে যায়—  ‘সব মরণ নয় সমান, সব মরণ নয় সমান।’    

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,808FansLike
19FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!