১৩ জুন, ২০২১রবিবার

১৩ জুন, ২০২১রবিবার

কলকাতার জনারণ্যে লোকচক্ষুর আড়ালেই অদ্ভুতভাবে পালিত হয় চিনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

১৯৫৯ সালে মৃণাল সেনের পরিচালিত নীল আকাশের নীচে সিনেমায় দেখানো হয়েছিল কালী বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত এক চিনাম্যানকে। কলকাতায় চিনাদের বসবাস তারও অনেক আগে থেকে। কবে থেকে যে চিনারা কলকাতায় নিজেদের আস্তানা গেড়েছিল সে এক আশ্চর্যের বিষয়। কালক্রমে পূর্ব থেকে পশ্চিম, এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতায় চিনাদের বিস্তার লাভ করে। কিন্তু কলকাতায় চিনা বলতেই টেরিটি বাজার, ট্যাংরা কিংবা চায়না টাউনের কথা মনে আসে কলকাতার বাঙালির।

 

ইতিহাস বলে ভারতে চিনারা এসে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল বজবজের অছিপুর এলাকায়। সেখান থেকেই তারা কলকাতায় এসে টেরিটি বাজার, বৌবাজার এবং চাঁদনিচক এলাকায় ছড়িয়ে পরে। সেই সঙ্গে তোপসিয়া, ট্যাংরা অঞ্চলেও তাদের বিস্তৃতি ঘটে। আর এই অঞ্চলই পরের দিকে হয়ে দাঁড়ায় চায়নাটাউন। মূলত অর্থনৈতিক কারণেই চিন থেকে কলকাতায় এসে বসতি স্থাপন করা চিনেরা কলকাতায় নানা রকম পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। কলকাতায় তৈরি হয়ে ওঠে নানান চিনে ক্লাব বা সংগঠন। এই চিনেরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো চিনে ক্লাব বা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। চিনেদের এই ক্লাবগুলো আবার গড়ে ওঠে কোনো না কোনো চিনামন্দিরকে কেন্দ্র করে। এই মন্দিরের নামে থাকে একটা কবরখানা, যেখানে মৃত্যুর পর ক্লাবের সদস্যদের কবর দেওয়া হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন
কলকাতার একটি অঞ্চলের নাম এই মাছের নামে, কালের ফেরে সেই মাছেরাই হারিয়েছে অস্তিত্ব

কলকাতার জনারণ্যে লোকচক্ষুর আড়ালেই অদ্ভুতভাবে পালিত হয় চিনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
ট্যাংরার চিনে কালিমন্দির লাগোয়া এমনই একটা কবরখানা হল ‘টং অন’

কলকাতায় কোথায় কোথায় চিনাদের কবরখানা আছে তা কিন্তু চট করে বোঝা যায় না, কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল চায়নাটাউনের যে রেস্তোঁরাগুলিতে বাঙালিরা মহাসমারোহে খানাপিনা করতে যায়, তার আশেপাশেই কিন্তু এই কবরখানাগুলি অবস্থিত। টেরিটিবাজার এলাকায় মোট ছটি চিনা মন্দির বিদ্যমান আর এই মন্দিরের যে কবরখানা সেগুলি সবকটা অবস্থিত ট্যাংরা এলাকায়। বছরের বেশিরভাগ সময়ই এই কবরখানাগুলি থাকে তালাবন্ধ অবস্থায়, শুধু চিনাদের বিশেষকিছু অনুষ্ঠান উপলক্ষেই সেগুলো খোলা হয়ে থাকে।

 

ট্যাংরার চিনে কালিমন্দির লাগোয়া এমনই একটা কবরখানা হল ‘টং অন’ (Tong Oon Chines Cemetery) । অন্ত্যেষ্টি নিয়ে চাইনিজদের নিজস্বকিছু ধ্যানধারণা এবং নিয়ম রয়েছে। তারা মনে করেন যে এই নিয়মগুলি পালন না করলে দুর্ভাগ্য নেমে আসবে তাদের পরিবারের উপর।চিনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নির্ভর করে পরিবারের সদস্যদের বয়স এবং পরিবারে তাদের ভূমিকা অনুযায়ী। যদি চিনা পরিবারে কোনো বয়স্ক মানুষের মৃত্যু হয় তাদের তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দায়িত্ব পরিবারের বড়োছেলে বা তার সন্তানদের উপর থাকে। অন্যদিকে যদি পরিবারের কোনো শিশুর মৃত্যু হয় তাহলে সেক্ষেত্রে শিশুটির অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার দায়িত্ব কিন্তু শিশুটির বাবা-মায়ের নয় বরং অন্ত্যেষ্টির দায়িত্ব বর্তায় সেই পরিবারের কোনো অবিবাহিত ব্যক্তির উপর। আবার যদি চিনা পরিবারে কোনো কম বয়সী কারও মৃত্যু হয় তাহলে সেই মৃতের চেয়ে বয়সে বড়ো পরিবারের সদস্যরা তাকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে পারবেন না।

আরও পড়ুন
খাবারের পাতেই নাচছে অক্টোপাস!

কলকাতার জনারণ্যে লোকচক্ষুর আড়ালেই অদ্ভুতভাবে পালিত হয় চিনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
চিনা পরিবারের কবরগুলো অর্ধচন্দ্রাকারে অনেকটা ঘোড়ার ক্ষুরের আকৃতির একটি বড়ো ঘেরাটোপের মধ্যে থাকে

চিনা পরিবারে কোনো শিশুর মৃত্যু হলে কোনোরকম অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পালন না করে তাকে নীরবেই কবর দেওয়া হয়। চিনেদের কবর দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল একবার নয় মৃতকে দু’বার কবর দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। প্রথমবার মৃতকে কবরখানাতেই একটা আলাদা জায়গায় মাটি খুঁড়ে কবর দেওয়া হয় পরিবারের বাকি সদস্যদের কবর থেকে খানিকটা দূরে। এরপর দু থেকে তিন বছর পর ওই কবর খুঁড়ে দেহাবশেষ তুলে এনে পরিপূর্ণ মর্যাদায় দ্বিতীয়বার পরিবারের বাকি সদস্যদের পাশে কবর দেওয়া হয়। কবরখানায় চিনা পরিবারের কবরগুলো অর্ধচন্দ্রাকারে অনেকটা ঘোড়ার ক্ষুরের আকৃতির একটি বড়ো ঘেরাটোপের মধ্যে থাকে।

 

ট্যাংরার টং অন চিনা কবরখানা স্থাপিত হয়েছিল প্রায় একশো বছরেরও আগে। এখনও মোটামুটিভাবে এই কবরখানাটির দেখাশোনা করা হয়। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকলাপ পালনের জন্য এই কবরখানার ভেতরে রয়েছে একটি ছোটো ডোবা। মাঝারিমানের এই কবরখানাটি বর্তমানে জনমানবহীন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন
২০০০ বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল যে ফল, আবারও খুঁজে পেলেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা

কলকাতার জনারণ্যে লোকচক্ষুর আড়ালেই অদ্ভুতভাবে পালিত হয় চিনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
‘চিং মিং’ উৎসবে চিনারা কবরখানায় জড়ো জয়ে পরিবারের মৃতদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন

মার্চ-এপ্রিল মাস নাগাদ চিনেরা কলকাতার এই কবরখানাগুলিতে জড়ো হন। আসলে এই দুটি মাসেই চিনাদের উৎসব ‘চিং মিং’ (Ching Ming, the festival of pure brightness) পালিত হয়। এই উৎসবে চিনারা কবরখানায় জড়ো জয়ে পরিবারের মৃতদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। এই উৎসব উপলক্ষে চিনারা নিজেদের পরিবারের কবরগুলি জল দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে ফুল, মোমবাতি ধূপকাঠি এবং নানা ধরণের চিহ্নসম্বলিত কাগজ দিয়ে সাজান এবং ওই বিশেষ চিহ্নসম্বলিত কাগজগুলি পোড়ানো হয়। সেই সঙ্গে পালন করা হয় বিশেষকিছু নিয়মকানুনও। এরপর সেখানেই পরিবারের সকলে মিলে সেখানেই বসে খাবার ভাগ করে খান। তাদের বিশ্বাস যে মৃত পরিবারের সদস্যও তাদের সঙ্গে সেখানে বসে খাবার খাচ্ছেন, সেই উদ্দেশ্যে একটি ফাঁকা প্লেটেও খাবার আলাদা করে রাখা হয়।

 

শুধু চিং মিং উৎসবেই নয় বরং আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে চিনাদের ‘চুং ইউং’ (Chung Yeung, Hungry Ghost Festival)উপলক্ষেও এই কবরখানাগুলিতে জড়ো হয় তারা। তখুও এখানে চিনারা নিজেদের পরিবারের মৃত সদস্যদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন।কালের নিয়মে কলকাতায় চিনাদের বসবাস অনেকটাই কমে গিয়েছে। বহু চিনারাই হয় দেশে ফিরে গিয়েছেন না হয় বিদেশে গিয়ে সেটল হয়েছেন।

আরও পড়ুন
দীর্ঘ ২৭০০ বছর ধরে দেশ শাসন করে চলেছে এই রাজপরিবার, ১২৬ জন সম্রাট বসেছেন সিংহাসনে

কলকাতার জনারণ্যে লোকচক্ষুর আড়ালেই অদ্ভুতভাবে পালিত হয় চিনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
চিনারা কবরগুলি জল দিয়ে ধুয়ে ফুল, মোমবাতি ধূপকাঠি এবং নানা ধরণের চিহ্নসম্বলিত কাগজ দিয়ে সাজান

আগের মতো আর কলকাতার রাস্তায় চিনে ফেরিওয়ালা বা চিনে দোকানদার বেশি দেখা যায় না। বউবাজার, টেরিটিবাজার, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট, ট্যাংরা, তোপসিয়া অঞ্চলে এখনও কিছু চিনে জুতোর দোকান টিমটিম করে জ্বলে। সেই সঙ্গে চাঁদনি আর চায়না টাউনে কিছু রেস্টুরেন্টেই কলকাতার চিনাদের অস্বিত্ব টিমটিম করে টিকে রয়েছে। তাই কলকাতার জনারণ্যে এক প্রকার লোকচক্ষুর আড়ালেই চিনাদের পরালৌকিক ক্রিয়া আজও পালিত হয়ে থাকে, কলকাতাবাসী শুধু চিনে খাবারেরই সন্ধানে ভিড় জমান টেরিটিবাজার বা চায়না টাউনে। কিন্তু তারও আড়ালে যে চিনাদের এক জীবন রয়েছে, তার খবর কেই বা রাখে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,808FansLike
19FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!