১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ:  রাজনীতির নতুন ‘আগামী’ নাকি অসাম্প্রদায়িক শ্রেণীর রাজনীতি ভান মাত্র!

একুশের বিধানসভা নির্বাচন জমে উঠেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেডে কংগ্রেস এবং আব্বাসের উপস্থিতি ভোট বাতাসের নতুন ধুনো ছড়িয়েছে। তৃণমূল-বিজেপি দ্বৈরথ লাগাতার যে বাইনারি তৈরি করেছিল তাও খানিক ম্লান হয়েছে সন্দেহ নেই। অবিরাম তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিজেপিতে গমন, এমনকি এক পক্ষের নেতার অন্য পক্ষের প্রধান মুখ হয়ে ওঠায়, ‘বিজেমূল’ শব্দবন্ধের বিরুদ্ধে যুক্তি খুঁজে পেতে হয়রান হচ্ছে বিজেপি, তৃণমূল- দু’তরফ‌ই। তার‌ই মাঝে সংযুক্ত মোর্চাও প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে ওঠায় ভোটের পাটিগণিতের সূত্র বিচিত্র সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরাও নির্দিষ্ট কিছু বলতে পারছেন না। অসংখ্য ‘যদি’ ‘কিন্তু’ ‘হয়ত’- তাদের বাক্যকেও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করছে। বেশ কয়েক দশকে জনসাধারণের শেষত একদিকে হেলে পড়ার বদলে বিধানসভার ত্রিশঙ্কু ঝুলে পড়ার সম্ভাবনাও রাজ-ভাবুকদের মাথায় ফিরে এসেছে।

 

 

এই পরিস্থিতির একটা হিল্লে করতে পারে একমাত্র ২ মে। তবে ফলাফল যাই হোক বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ এর জোট বাংলা রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিল, একথা বুঝতে মে মাসের জন্য অপেক্ষা না করলেও চলে। ২০১৬ সালে বাম-কংগ্রেসের জোটের ভেতরে একটা অস্বচ্ছন্দতা ছিল। অস্বস্তি মুক্ত ছিল না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা, যার সিংহভাগ বামাচারী, তারা জোটের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, বিব্রত করেছিলেন জোটকে। ২১ এর ভোটের বহু আগে থেকেই বহু ক্ষেত্রে যৌথ আন্দোলন সে কালিমা কিছুটা লাঘব করেছে। দ্বিতীয়ত, মমতা ব্যানার্জির শাসনের আরও পাঁচটা বছর সরকার বিরোধীদের জোটকে স্বাভাবিক মান্যতা দিয়েছে। তৃতীয়ত, সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান এবং ক্ষমতার খুব কাছাকাছি চলে আসা জোটের পথকে মসৃণ ও প্রশ্নহীন করেছে। চতুর্থত, তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার চল- দু’দলের নীতিগত পৃথক সত্তা’কে এবং বিরোধিতার নৈতিকতাকে প্রশ্নচিহ্নের মধ্যে দাঁড় করিয়েছে।

আরও পড়ুন
জনমত: ঠাকুর ডুগডুগি বেজে উঠেছে, এবার আপনি নাচবেন না নাচবেন না, তা আপনিই ঠিক করুন!

বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ:  রাজনীতির নতুন 'আগামী' নাকি অসাম্প্রদায়িক শ্রেণীর রাজনীতি ভান মাত্র!
তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার চল- দু’দলের নীতিগত পৃথক সত্তা’কে এবং বিরোধিতার নৈতিকতাকে প্রশ্নচিহ্নের মধ্যে দাঁড় করিয়েছে

 

এতদূর পর্যন্ত ঠিক ছিল বিষয়টি। আবার তাল পাকাল আকস্মিক‌ই বলা চলে, ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা তরুণ প্রজন্মের মুখ হিসেবে আব্বাসের রাজনীতির ময়দানে হঠাৎ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠায়। মুসলিম-দলিত সমাজের জন্য সরাসরি ভোটে লড়ার প্রস্তাব নিয়ে তিনি এবার রাজনৈতিক দলগুলির কাছে যান। আরএসএস-বিজেপির ক্ষমতার কাছাকাছি চলে আসার উদ্বেগ‌’ই প্রধানত তাকে এতদূর ভাবায়। তৃণমূলের কাছে তার বাংলার ৪০টি সিটের দাবি ছিল। শর্ত ছিল তার বিনিময় বাকি সমস্ত সিটে তৃণমূলকে সমর্থন করবেন। তৃণমূল সুপ্রিমো রাজি হননি। কিন্তু বাম-কংগ্রেস জোটের মধ্যে আব্বাস সেঁদিয়ে যাবেন এতদুরও হয়ত ভাবেননি তিনি। কিন্তু আব্বাসরা আর দয়া চান না, অংশ নিতে চান- হয়ে উঠতে চান ‘নিয়ন্ত্রক শক্তি’।

 

 

একদিকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আপোষহীন বামপক্ষের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মগুরুর তৈরি দলের জোট, রাজনীতির নৈতিকতাকে আবারও বহু প্রশ্ন চিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন সংখ্যালঘুর সাম্প্রদায়িকতাও ‘সাম্প্রদায়িকতা’। এই তোষণ এবং কার্যত স্খলন বাম রাজনীতির ভিতকে দুর্বল করে দেবে। কিন্তু সমস্যা বাঁধে আব্বাস যখন তার দলের নাম দিয়ে বসেন Indian Secular Front। যখন সেই ফ্রন্টে দলিত-আদিবাসী-নমঃ-শূদ্রদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করেন। বাম ব্রিগেডের ময়দানে সম্প্রীতি, একতা, বাঙালিত্ব, আম্বেদকর এর কথা তোলেন। ধর্ম আর ভাত কে পৃথক করেন। ফলে ফুরফুরা শরীফের আব্বাস সিদ্দিকী আর আইএসএফ এর সিদ্দিকী তখন আলাদা হয়ে যান। গরিবের কর্মসংস্থান তার মুখ্য চাহিদা হয়ে যায়- তখন দুইয়ে দুইয়ে চার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন
এক্সক্লিউসিভ: মুখোমুখি হান্নান মোল্লা – বাংলার কৃষকরা এই আন্দোলনে নেই এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা

বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ:  রাজনীতির নতুন 'আগামী' নাকি অসাম্প্রদায়িক শ্রেণীর রাজনীতি ভান মাত্র!
তাল পাকাল আকস্মিক‌ই বলা চলে, ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা তরুণ প্রজন্মের মুখ হিসেবে আব্বাসের রাজনীতির ময়দানে হঠাৎ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠায়

 

নিজের সম্প্রদায়ের অসহায়ত্বের জায়গা থেকে তার রাজনীতির ময়দানে অসাম্প্রদায়িক শ্রেণীর রাজনীতি কি ভান মাত্র? তিনি কি বামপন্থীদের ব্যবহার করবেন এবং দুর্বল‌ও? নাকি গণতান্ত্রিক রাজনীতির আদব-কায়দা, বাম রাজনীতির সঙ্গে ঘর না হলেও পড়শির সম্পর্ক নতুন করে আয়নার সামনে দাঁড় করাবে তাদেরও? বাম রাজনীতি কি কেবল মুসলিম ভোটের একাংশ প্রাপ্তির লোভে আব্বাসের দাবি মেনে নিয়েছে? নাকি আব্বাসদের দুঃখকে নতুন করে অনুভব করতে সক্ষম হবে তারা? এবার দলিত-নমঃশূদ্রদের জোটের সঙ্গে মেলা-মেশা, শ্রেণী রাজনীতির সঙ্গে কোন এক ফাঁকে মেলাতে চাইবে ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ এর ভারতীয় বাস্তবতাকে? উত্তর সময় দেবে।

আপাতত এই দুই মাসের পূর্বের সিদ্দিকী আর পরের সিদ্দিকীর বাক্যে-শব্দে-উচ্চারণে চিন্তায় যে বিচক্ষনতা বিবেচনার দেখা মিলছে- এ পোড়া দেশে তাই বা কম কি?

গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট
গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট
লেখক , অধ্যাপক এবং নাট্যকার

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,820FansLike
20FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!