১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১রবিবার

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১রবিবার

সময়ের অতলে হারিয়ে যাওয়া দুই বাংলার মেয়েদের ব্রত অনুষ্ঠান

দেশ ভাগ হওয়ার পূর্বে সমগ্র বঙ্গদেশে নানান ধরনের সংস্কৃতি, রীতিনীতি পালিত হতো। কাঁটাতারের বাঁধনে ভৌগোলিকভাবে দ্বিখণ্ডিত হলেও আজও বঙ্গীয় সংস্কৃতির প্রসার দুই বাংলা জুড়েই বিরাজমান। মেয়েদের বিভিন্ন ব্রতানুষ্ঠান, স্থানীয় মেলা, উৎসব- পার্বণ ইত্যাদির ইতিহাস দুই বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছেয়ে আছে। তবে ঐতিহাসিক টানাপোড়নে বাঙালি সমাজ বারবার বিভাজিত হয়েছে নানাভাবে। ফলত, আমরা হারিয়েছি সমাজজীবনের বহু ব্রত- অনুষ্ঠান যার অসাম্প্রদায়িক চেতনা বোধের বার্তা আজও আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। সময়ের নিয়মে সমাজজীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া এমন দুটি ব্রতানুষ্ঠান- মাঘমণ্ডলব্রত এবং সূর্যব্রত।

 

যখন কৃষিসভ্যতার সূত্রপাত ঘটে, আদিম নারীরা হয়তো অজান্তেই আবিষ্কার করেছিলেন ফসল উৎপাদনের কৌশল। সারা বিশ্বের বিভিন্ন আদিম জাতি, উপজাতির মধ্যে সূর্যের উপাসনা করার রীতি লক্ষ্য করা যায়। আদিম সমাজের মতে নারী যেমন সন্তান ধারণ করতে পারেন তেমনই শস্য উৎপাদনে নারীদের ভূমিকা অপিরিসীম। তাই তারা আদিম সূর্যদেবতার সঙ্গে কুমারী নারীর সংযোগ খুঁজে পেতেন। বাঙালি হিন্দু- কুমারী মেয়েদের মাঘমণ্ডল ব্রত পালন করা আবশ্যিক ছিলো একটা সময়ে। সিলেট- কাছাড়, বিক্রমপুর, ঢাকা, কুমিল্লায় এই ব্রতটির প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। মূলত সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু হওয়ার মুহূর্তে এই ব্রতটি পালন করা হয়।

আরও পড়ুন
জীবনের সব স্মৃতি নিয়ে আর্জেন্টিনার সমুদ্রগর্ভে দোতলা বাড়ি!

বাঙালি হিন্দু- কুমারী মেয়েদের মাঘমণ্ডল ব্রত পালন করা আবশ্যিক ছিলো একটা সময়ে, ছবি : রোয়ার বাংলা

 

একজন বালিকা পাঁচ বছর বয়স থেকে ঋতুমতী হওয়ার আগে পর্যন্ত নানা সাধনার মাধ্যমে পালন করে ব্রতটি। মাঘ মাসের প্রবল শীতে ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারে পালন করা হতো এই ব্রত। আধুনিক সমাজে ছোটো থেকে যেমন দৈহিক এবং মানসিক বিকাশের জন্য স্কুলগুলিতে  বিভিন্ন কার্যকলাপের সঙ্গে বাচ্চাদের যুক্ত রাখা হয় ঠিক একইভাবে গ্রামীন সমাজে বিভিন্ন লৌকিক ব্রতগুলি পালনের মধ্য দিয়ে শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য সুশৃঙ্খল, কঠোর পরিশ্রমী, স্বাবলম্বী মানুষ হওয়ার পাঠ শিখিয়ে এসেছে।

 

মাঘমণ্ডল ব্রতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক শিল্পকলার ইতিহাস। যা মণ্ডল শিল্পকলা নামে প্রচলিত ছিলো বঙ্গদেশে। প্রথমে বাড়ির মুক্ত আঙিনায় একটি মাটির ভিটি তৈরি করা হয়। তারপর কোনো প্রবীণ নারীর সহজে এই ভিটির চারপাশে ইঁটের গুঁড়ো, হলুদ গুঁড়ো, রঙিন বালি, শুকনো পাতার গুঁড়ো সহযোগে মণ্ডলক্রিয়া সম্পন্ন করে ব্রতিনী। ছোট থেকেই এই রঙিন শিল্পকলা শিশুদের মনে আনন্দ দেয়।

আরও পড়ুন
বাবার নজর এড়িয়ে বন্দুকের নলে মদ খেতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল সম্রাট আকবরের এই সন্তানের

লৌকিক ব্রতগুলি পালনের মধ্য দিয়ে শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য সুশৃঙ্খল,স্বাবলম্বী মানুষ হওয়ার পাঠ শিখিয়ে এসেছে, ছবি : রোয়ার বাংলা

 

প্রাচীন জাদুমন্ত্রে বিশ্বাস করতেন সমসাময়িক মানুষেরা। অল্পনার থেকেও শ্রীহট্ট কাছাড়ে বেশি জনপ্রিয় ছিলো এই মণ্ডলক্রিয়া। রঙের গুঁড়ো ব্যবহার করে সূক্ষ শিল্পকর্মের সঙ্গে শিশুর মনোজগতের বিকাশ ঘটতে থাকে। এছাড়াও নানা ধরণের ফুল, পাতা সংগ্রহ করতে করতে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে। এবং কথ্য ভাষায় ছড়ার মতো বিভিন্ন মন্ত্র আওড়ানোর মাধ্যমে পৌরাণিক, সামাজিক বিভিন্ন গল্প শিশুরা জানতে পারে। এই ব্রতক্রিয়ায় কোনো পুরোহিতের প্রয়োজন হয়না। ঘরের বয়স্কা মহিলা সঞ্চালনা করেন।

 

মাটির ভিটিতে একটি অনন্ত নাগ এঁকে তার মধ্যে সাতাশটি কোঠা তৈরি করা হয় এবং অবশেষে সাপের লেজ ও ফণা একত্রে এনে উত্তরমুখী করা হয় মণ্ডলটিকে। মাটির ভিটিতে একটি চৌক এবং একটি গোলাকার কল্পিত পুকুর কাটা হয়, যেখানে দুর্বাগুচ্ছ হাতে নিয়ে জল নাড়তে নাড়তে মন্ত্র উচ্চারণ করেন বালিকারা।

আরও পড়ুন
কন্ডোম দিয়ে মেরামত করা কায়াকের সাহায্যে সোনা জিতলেন প্রতিযোগী

কাঠের পিঁড়িতে আল্পনার সেজে উঠেছে বিষ্ণুর অন্তিম শয্যা, ছবি : রোয়ার বাংলা

 

এরপর সাতাশ রকম অঙ্কিত মণ্ডলচিত্রে সূর্যদেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয় ফুল। চাঁদ, সূর্য, পৃথিবী, তিনকোণ, সমকোণ, মাঘমণ্ডল, সিংহাসন, ভিঙ্গার পানি, থালা- ভাত, বাপ রাজা, সোনার কুণ্ডল, দোলা, ভাই প্রজা, আইঙ্গন- বাইঙ্গন, আটপুজি, তিনকুণ্ডলী, আটেশ্বর, তিনরাজ, শাঁখা, সিঁদুর, চিরুনি, কাজল- আলতা, শাড়ি, কলা- জিয়ারী, দেউ- দুয়ার ও স্বর্গ- দুয়ার।

 

প্রত্যেকটি দব্যসামগ্রীর বাস্তবজীবনে কামনা করে ছাড়ার মতো মন্ত্রচারণ করেন ব্রতিনী। মাটির ভিটিতে আঁকা হয় একটি পালকী, যেখানে ছয় বেহারা পালকী বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন যা আসলে ষড়রিপুর প্রতীক, এবং পালকীর ভেতরে নববধূ আসলে নবজীবনের প্রতীক। এগিয়ে চলার এই মূল মন্ত্র। মণ্ডলক্রিয়ায় বসে একটি ছাতা ঘোরাতে থাকেন ব্রতিনী। এবং সেই ছাতার ওপর তিল, চিড়া- মুড়ির নাড়ু ইত্যাদি নানা ভোজ্যদ্রব্য ফেলা হয় আর সেগুলি সংগ্রহ করেন পুজোয় আমন্ত্রিত অতিথীরা।

আরও পড়ুন
প্রথমবার কৃষ্ণ গহ্বরের শেষ খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা

মাটির পাটায় আঁকা মাঘমণ্ডল ব্রতের অনন্য চিত্রকল্প, ছবি : রোয়ার বাংলা

 

শীতের কুয়াশা ভেঙে সূর্যের অভ্যুদয়ের উৎসব বলা যেতে পারে। অন্ধকার কাটিয়ে আলোর প্রবেশ সমাজজীবনে। শুধুই ধর্মীয় রীতি নয় এর মধ্যেই রয়েছে রাজনৈতিক মোড়ক। পুরুষশাসিত সমাজে ধর্মীয় আচার- অনুষ্ঠানে মেয়েদের অধিকার জানানোর প্রতিবাদ। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সেসময়ে মেয়েদের যেইভাবে সম্পূর্ণ পুরুষদের ওপর নির্ভির করতে হতো তার বিরুদ্ধে এ এক প্রতিবাদ। কারণ ব্রতাঅনুষ্ঠানে কোনোরকম পুরুষের অধিকার নেই, এমনকি পুরোহিতের সাহায্যও লাগেনা।

 

তবে সমাজে পুরুষদের ভূমিকাকে কোনোরকম অগ্রাহ্য করা কিংবা অপমান করার উদ্দেশ্য নেই এই মাঘব্রততে। আত্মকেন্দ্রিকতা নয় বরং দেবতার কাছে নিজের বাবা, ভাই, স্বামী, সমাজের মঙ্গল কামনা করার অনুষ্ঠান এই ব্রতপালন।

আরও পড়ুন
ইঞ্জিনে চড়ে মোদির স্মৃতিবিজড়িত রেল স্টেশন সফরে নতুন রেলমন্ত্রী, পড়তে হল রোষের মুখে

শিশু ব্রতিনী বিভিন্ন প্রতীক চিহ্নে ফুলপাতা ধরে মন্ত্র পড়ছে, ছবি : রোয়ার বাংলা

 

শ্রীহট্ট- কাছাড়ে মাঘমণ্ডলের মতো কালঠাকুরের ব্রত পালিত হয়। সমস্ত বয়সের মহিলারা পালন করতে পারেন এই ব্রত। মাঘমাসের এক রবিবার উপোস করে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন ব্রতিনী’রা। মাঘব্রতের মতো এখানেও মাটির ভিটি প্রস্তুত করে বিভিন্ন বিষয়বস্তুর আঁকা হয় যেমন চন্দ্র- সূর্য- পৃথিবী, কদমগাছ, গাছের নীচে রাধা- কৃষ্ণের যুগলমূর্তি, নানারকম নকশা ইত্যাদী।

 

সাধারণত মেয়েলি ব্রততে মহিলারাই পুরোহিতের কাজ করেন। কিন্তু সূর্বব্রতর ক্ষেত্রে পুরোহিতের মন্ত্রে পুজো সম্পন হয়। সূর্যব্রতে নারীরা বৃত্তাকারে একত্রিত হয়ে ধামাইল গান ও নৃত্যে যুক্ত হন। শ্রীকৃষ্ণের জন্মলীলা, ব্রজলীলা ইত্যাদী গানের আকারে পরিবেশন করা হয়।

আরও পড়ুন
দেখুন হনুমানের মাতৃস্নেহ, তাক লেগে যেতে বাধ্য

সূর্যব্রতে ঘিয়ের প্রদীপ হাতে নিয়ে ব্রতিনীরা, ছবি : রোয়ার বাংলা

মাঘব্রত কিংবা সূর্যব্রত উভয় লৌকিক অনুষ্টানেই নারীদের মুখ্য ভূমিকা, নারীদের প্রাধান্যই লক্ষ্য করা যায়। কালের নিয়মে ঋতিগুলি সমাজ থেকে বিলুপ্ত হলেও, একসময় নারীদের জীবনভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছে এই লোকচারকেন্দ্রিক ব্রতানুষ্ঠানগুলি।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,808FansLike
19FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!