১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

এই বাঙালি জনগোষ্ঠির নিয়ম বিয়ের পাকা কথা বলতে পাত্রীর বাড়িতে মদ নিয়ে যেতে হবে পাত্রের বাবাকে!

বিয়ে এমন একটি সামাজিক বন্ধন, যা দুটি মানুষ এবং দুটি পরিবারকে এক সূত্রে বেঁধে রাখে। প্রতিটি দেশের সামাজিক স্তরে বা প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ের যা যা রীতিনীতি ও নিয়মকানুন গড়ে উঠেছে সবকটিই বিপরীতকামী মানুষজনের একসঙ্গে পথচলার ধারণার উপর ভিত্তি করে। এককথায় বিয়ে বলতে গড়পড়তা মানুষজন বোঝেন একজন নারী ও পুরুষের একসঙ্গে ঘর বাঁধার কথা। এই বিয়েকে কেন্দ্র করেই নানা রকম আচার উপাচার প্রচলিত আছে নানা দেশের নানা সমাজে। ভারত তথা বাংলাদেশের একটি উপজাতি গোষ্ঠী আছে যাদের চিরাচরিত বিয়ের নিয়মে এক অদ্ভুত রীতি লক্ষ্য করা যায়।

 

পাত্রীর বাড়িতে পাত্র পক্ষ বিয়ের আগে বেশ কয়েকবার যাবেন এটি খুব একটা আশ্চর্যজনক বিষয় নয়। কিন্তু এই উপজাতি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে নিয়ম আছে পাত্রের বাবা পাত্রীর বাড়িতে বিয়ের আগে মোট তিনবার যাবেন। মজা হচ্ছে প্রচলিত রীতিটি এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। পাত্রর বাবা এই যে তিনবার পাত্রীর বাড়ি যাবেন, তখন প্রত্যেকবার তাকে হাতে করে উপহার নিয়ে যেতে হবে! সেই উপহার যদি পাত্রীর পরিবারের মন মতো না হয় তাহলে গোড়াতেই যাবতীয় কথাবার্তা থেমে যাবে। স্বাভাবিকভাবেই বিয়ের কথা আর এগোবে না। আরও এখানেই রয়েছে টুইস্ট।  শেষবার অর্থাৎ তৃতীয়বার পাত্রের বাবা যখন পাত্রীর বাড়িতে যাবেন সেই সময় হাতে করে মদ নিয়ে যেতে হয়! এটাই রীতি। এই মদ নিয়ে যাবার ঘটনাটিকে বলা হয় মদপিলাং। 

আরও পড়ুন
পুরুলিয়ার নাচনিদের জীবনের মতোই মিলে গিয়েছে গেইশাদের জীবন, বঞ্চিত সংসার ধর্ম থেকে

 

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের চাঙমা জনগোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিয়ের এই নিয়ম চলে আসছে। এই জনগোষ্ঠীটি নিজেদের চাঙমা নামে ডেকে থাকলেও বহির্বিশ্বের কাছে তারা চাকমা নামে পরিচিত। তবে লক্ষণীয় বিষয় হল যুগের হাওয়া এড়িয়ে যাওয়া খুব কঠিন, তাই বাংলাদেশের চাকমা আদিবাসীদের মধ্যেও ছেলেমেয়েরা নিজের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করা শুরু করেছে। 

 

কেবলমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, ভারতের ত্রিপুরা এবং অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যের চাকমা আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষেরা বসবাস করেন। এদের বিবাহের আরও একটি নিয়ম প্রচলিত ছিল- পরিবার দেখেশুনে অর্থাৎ সম্বন্ধ করে বিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অতীতেই চাকমা ছেলেমেয়েরা নিজের পছন্দমতো বিয়ে করতে পারত। সে ক্ষেত্রে দুই পক্ষের পরিবার মেনে নিলে পুরুষতান্ত্রিক চাকমা সমাজে মেয়েরা শ্বশুর বাড়িতে এসে ঘর সংসার করত। কিন্তু মেয়ের পরিবার যদি এই বিয়ে না মেনে নিত তবে ছেলে এবং মেয়েটির পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করারও বিধান ছিল। কিছুদিন পর তারা আবার ফিরে আসত। তখন‌ও যদি পরিবার না মেনে নিত তারা আবার পালাত!

আরও পড়ুন
গাজনের ইতিকথা ২- নবাব আলিবর্দি খাঁ গাজন দেখতে এসেছিলেন অম্বুলিঙ্গ শিবের মন্দিরে

 

এইভাবে পরপর তিনবার পালানোর পর এই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব নিয়ম-কানুন অনুযায়ী পরিবার বাধ্য হত তাদের বিয়ে মেনে নিতে। অনেক সময় অবশ্য পরিবার না মানলে প্রথমবার পালানোর পর‌ ছেলে বা মেয়েটি তার সঙ্গীকে ছেড়ে পরিবারের পছন্দমত পাত্রী বা পাত্রকে বিয়ে করত। কালের নিয়মে এইরকম বিয়ের পদ্ধতি ক্রমশ লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তবে পরিবারের দেখাশোনা করে বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মেয়ের বাড়ি ছেলের বাবার তিনবার উপহার নিয়ে যাওয়ার রীতিটি এখনও প্রচলিত।চাকমারা কিভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসতি গড়ে তুলল তা নিয়ে একটি ঘটনা প্রচলিত আছে। অনেকে এটিকে লোককথা বলেন, আবার অনেকে এটিকেই ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসাবে তুলে ধরেন।

 

বর্তমান ত্রিপুরার কাছে অবস্থিত চম্পকনগরের রাজা ছিলেন সাধেঙগিরি। তার বড় ছেলে বিজয়গিরি এবং ছোট ছেলে সমরগিরি অত্যন্ত দক্ষ যুবরাজ ছিলেন। একবার বিজয়গিরি দুর্ধর্ষ সামরিক অভিযান চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং আরাকান তথা মায়ানমারের দক্ষিণ দিক দখল করে নেন। কিন্তু সেই সময়ে রাজা সাধেঙগিরি মারা যান। পিতার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বিজয়গিরি যখন চম্পকনগর ফিরে যাওয়ার বন্দোবস্ত করছেন তখন হঠাৎই খবর পান ভাই সমরগিরি রাজ্য দখল করে নিয়ে সিংহাসনে বসে পড়েছেন।

আরও পড়ুন
গাজনের ইতিকথা- একসময় চড়ক প্রথাটিকেই অমানুষিক আখ্যা দিয়েছিল খ্রিস্টান মিশনারিরা

বিজয়গিরি বুঝতে পারেন  নিজের অধিকার ফিরে পেতে গেলে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। আপনজনের সঙ্গে যুদ্ধের চিন্তা মাথায় আসতেই মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায় চম্পকনগরের বড়ো যুবরাজের। তিনি ঠিক করেন আর ফিরে যাবেন না। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলেই বসবাস করবেন। তার অনুগত সৈন্যরাও চট্টগ্রামে থেকে যায়। কয়েকদিন পর বিজয়গিরি তার অনুগত সৈন্য এবং পারিষদদের স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অনুমতি দেন।

 

চাঙমা বা চাকমারা মনে করে বিজয়গিরির অনুগত সৈন্যরা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ফলে নতুন যে জনগোষ্ঠীর প্রসার ঘটে তারা তাদের‌ই বংশধর। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী বিজয়গিরি পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আরাকান শাসন করেছিলেন ৬১৫-৬৪৫ সাল পর্যন্ত।

আরও পড়ুন
শেষ সোনালি ইগল শিকারি: খাবারের সংকট দূর করতে ছ’ হাজার বছর ধরে ইগল পোষেন এই সম্প্রদায়

 

চাকমারা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। তারা বৌদ্ধ ধর্মের হীনযান মতবাদ অনুসরণ করে থাকেন। তবে সেই সঙ্গে নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী বেশকিছু আচার-আচরণও পালন করে, যা দেখে অনেকের মনে হতে পারে হিন্দু ধর্মের প্রভাব আছে এই আদিবাসী গোষ্ঠীর ওপর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন চাকমা জনগোষ্ঠীর রাজা ত্রিদিব রায় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানকে সমর্থন করেন। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা জয়লাভ করলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে গঠিত হলে ১৯৭১ সালে ত্রিদিব রায় বাংলাদেশ ছেড়ে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ চলে যান এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

ঘটনা হল স্বাধীন বাংলাদেশে গড়ে ওঠার পর সে দেশের বাঙালিদের একাংশ চাকমা আদিবাসী গোষ্ঠীকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী হিসাবে চিহ্নিত করে। কিন্তু দলগতভাবে চাকমারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তেমন নয়। রাজা ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের বিরোধিতা করলেও চাকমা সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। এমনকি ত্রিদিব রায়ের নিজের কাকা কোকনদাক্ষ রায় নিজে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

আরও পড়ুন
জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বসন্তে আজ লিঙ্গরাজের উৎসবে

 

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল বাংলাদেশের আরেক আদিবাসী সম্প্রদায় ম্রোং-দের থেকে চাকমারা অনেক বেশি মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন। তাদের মধ্যে শিক্ষার প্রচলন যেমন অনেক বেশি, তেমনি আধুনিক নগর সভ্যতার অনেক উপকরণকেই আপন করে নিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের এই আদিবাসী সম্প্রদায়।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,820FansLike
20FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!