১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১রবিবার

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১রবিবার

সেদিন এই চা শ্রমিকদের ওপর শাসকের নিষ্ঠুর অত্যাচারের প্রতিবাদ করেননি গান্ধীজীও!

পরাধীন ভারতের চরম শোষিতদের এক আন্দোলন এবং সেই শোষিতদের সঙ্গে ভারতের তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদদের বিশ্বাসঘাতকতার এক অজানা কাহিনী ইতিহাসের মুখ লুকিয়ে রয়ে গিয়েছে আজও। ১৯২১ সালে গান্ধীজীর ডাকে তখন সমগ্র ভারত জুড়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলন মনে বল যুগিয়েছিল অসম এবং সিলেটের চা শ্রমিকদের। তারা ঠিক করেন বাগান মালিকদের শোষণের বেড়াজাল কেটে নিজেদের আদি বাসস্থান ফিরে যাবেন।

 

আসলে তৎকালীন অসম এবং সিলেটের চা বাগানগুলির মালিক ছিল ইংরেজ সাহেবরা। তারা শুধু যে শোষণ করত এই শ্রমিকদের তা নয়, বলা ভালো তাদেরকে প্রায় ক্রীতদাস করে রেখেছিল। চা বাগানের ওই হাড়ভাঙা পরিশ্রম করার জন্য এই স্থানীয় অঞ্চলের বাঙালিরা সাধারণত রাজি হত না। তাই তৎকালীন মধ্যভারত, ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল, দক্ষিণের মাদ্রাজ থেকে বিপুল অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে দালালদের মাধ্যমে সেখানকার গরিব মানুষদের এই চা বাগানে নিয়ে আসা হত। এর জন্য এক অদ্ভুত গল্প ছড়াতো ওই দালালরা। তারা বলত সুদুর পূর্বে এমন এক জায়গা আছে যেখানে গাছের পাতায় পাতায় সোনা ফলে থাকে। গাছ ধরে ঝাড়া দিলেই তা হাতে এসে পড়বে! এই গরীব মানুষেরা একটু ঐশ্বর্য, একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার লোভে কোন‌ও কিছু বিচার বিবেচনা না করে ওই দালালদের খপ্পরে গিয়ে পড়ত। 

আরও পড়ুন
তিন বছরের শিশু গিলে ফেলল আস্ত গণেশ মূর্তি!

শ্রমিকদের নিয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এক অদ্ভুত চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করত চা বাগান মালিকরা

 

দালালরা ঐ সমস্ত জায়গার গরিব মানুষ, বিশেষত সেখানকার আদিবাসী ও দলিতদের এই সমস্ত চা বাগানে শ্রমিকের কাজ করার জন্য নিয়ে আসত। এই অশিক্ষিত শ্রমিকদের নিয়ে এরপর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এক অদ্ভুত চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করত চা বাগান মালিকরা। সেই চুক্তিপত্রকে এই শ্রমিকরা বলত ‘গিরমেন্ট’। তারা যেহেতু এগ্রিমেন্ট শব্দটা উচ্চারণ করতে পারত না, তাই তাকে বদলে নিয়ে এরকম নাম দিয়েছিল।

 

কিন্তু ওই চুক্তিপত্র হত তাদের কাল। এক প্রকার খাঁচার মধ্যে তাদেরকে বন্দি করে রাখা হত এরপর।  তাদের নিষ্পেষিত করে এমনভাবে তাদের জীবনটা যাপনে বাধ্য করা হয়েছিল যে ওই চা বাগানের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতাই থাকত না তাদের। কারণ প্রথমদিকে এই চা বাগান শ্রমিকদের কোন‌ও বেতন দেওয়া হত না। তার বদলে পাতের তৈরি পাতলা টি-টোকেন দেওয়া হত। এর সাহায্যে একমাত্র নির্দিষ্ট চা বাগানের ভেতর থাকা দোকান থেকেই তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করতে পারত। প্রতিটি চা বাগানের জন্য পৃথক পৃথক টি-টোকেনের ব্যবস্থা থাকত। এর মাধ্যমে অন্য চা বাগান অঞ্চলে গিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করা যেত না। অর্থাৎ এই চা শ্রমিক বা ক্রীতদাসদের আর্থিকভাবে এমন পরিস্থিতিতে রাখা হত যে তারা চা-বাগানের বাইরে পা রাখলে গোটা জীবনটাই তছনছ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

আরও পড়ুন
জন্মদিনের ছবি পোস্ট করার মিনিটখানেকের মধ্যে বোল্ডারের ধাক্কায় মৃত জয়পুরের তরুণী চিকিৎসক

প্রথমদিকে এই চা বাগান শ্রমিকদের কোন‌ও বেতন দেওয়া হত না

এই পরিস্থিতিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের টি-টোকেনের বদলে বেতন ব্যবস্থা চালু করা হয়। তবে সেই বেতন যথেষ্ট কম ছিল। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্যবসায় মন্দা আসায় চা শ্রমিকদের মাসিক বেতন কমিয়ে মাত্র তিন পয়সা করে দেওয়া হয়। এতে করে এক বেলা পেট ভরে খাওয়া সম্ভব ছিল না গোটা পরিবারের। অথচ চা মালিকরা যখন ৪৫০ গুন বেশি লাভ করেছে তখন শ্রমিকদের বেতন এক পয়সাও বাড়ায়নি তারা। এবার মন্দাভাব তৈরি হওয়ায় তারা বেতন এক ধাক্কায় অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে দেয়।

 

এই অসহনীয় অবস্থা চা শ্রমিকদের আরও ক্ষুদ্ধ করে তোলে। এই সময়ে গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলে সেই খবর লোকমুখে অসম ও সিলেটের চা-বাগানে ছড়িয়ে পড়ে। এখানকার অত্যাচারিত শ্রমিকরা সিদ্ধান্ত নেয় এই অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেবে এবং চা-বাগান ত্যাগ করে নিজেদের মুলুক অর্থাৎ ভিটেতে ফিরে যাবে। তাদের এই পদক্ষেপের বা আন্দোলনের নাম ছিল ‘মুলুক চলো’ আন্দোলন।

আরও পড়ুন
জিভের রং গাঢ় হলুদ বিরলতম অসুখে আক্রান্ত এই ১২ বছরের কিশোর

তাদের এই পদক্ষেপের বা আন্দোলনের নাম ছিল ‘মুলুক চলো’ আন্দোলন

 

এই সময় চা বাগানের মালিকরা রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আটকে দিয়ে, বন্দরে পুলিশ মোতায়েন করে শ্রমিকদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার ওপর নানারকম উপায়ে বাধাদানের চেষ্টা করে। কেবলমাত্র যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত সেই সময় চা শ্রমিকদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তার চাপেই রেল কোম্পানির অল্প কিছু চা শ্রমিককে ট্রেনের টিকিট বিক্রি করতে বাধ্য হয়।

 

সবচেয়ে নারকীয় ঘটনা ঘটে ১৯২১ সালের ২০ মে। ঐদিন বর্তমান বাংলাদেশের চাঁদপুর রেল স্টেশনে অজস্র শ্রমিক রাত কাটিয়েছিলেন। কারণ পরের দিন সকালে ট্রেন ধরে তাদের বাড়ির দিকে রওনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চাঁদপুরের মহকুমা শাসক সুশীল কুমার সিংহের নেতৃত্বে গোর্খা সেনারা ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রায় তিন হাজার শিশু, নারী, পুরুষ, বৃদ্ধকে ওই রেল স্টেশনেই বেয়োনেটের খোঁচায় এবং গুলি চালিয়ে হত্যা করে। অনেক শিশুকে পার্শ্ববর্তী মেঘনা নদীর জলে ছুঁড়ে ফেলা হয়!

আরও পড়ুন
ড্রোনের সাহায্যে আকাশ থেকে কৃত্রিম জলধারা নেমে এলো দুবাইয়ের বুকে

ই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানানোর পরিবর্তে তার তীব্র বিরোধিতা করেন মহাত্মা গান্ধী

 

এরপরই সেই মর্মান্তিক বিষয়টি ঘটে। এরকম নৃশংস গণহত্যার পর এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানানোর পরিবর্তে তার তীব্র বিরোধিতা করেন মহাত্মা গান্ধী! তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন এই আন্দোলনকে তিনি সমর্থন করেন না। কারণ তাঁর মতে অসহযোগ আন্দোলন পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে ছিল না, তা ছিল কেবলমাত্র ইংরেজদের বিরুদ্ধে! তিনি এটাও বলেন শ্রমিকদের উচিত চা বাগানে ফিরে গিয়ে মালিকদের কথা মত কাজ করা। সেইদিন গান্ধীজী সহ ভারতের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের এক নক্কারজনক রূপ দেখেছিল এই অসহায় মানুষগুলি। যদিও তারা হতদ্যম হয়ে পড়েননি। বেশিরভাগ শ্রমিক আর চা-বাগানে ফিরে না গিয়ে কোনরকমে নিজেদের ভিটের দিকে রওনা দিয়ে দেন।

 

সেই সময় তাদের সমর্থনে একমাত্র এগিয়ে এসেছিলেন রেল শ্রমিক আন্দোলনের নেতা দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। তার নেতৃত্বে টানা আড়াই মাস রেল ধর্মঘট চলে বাংলা ও অসম জুড়ে। এর ফলে প্রায় ৫ হাজার রেল শ্রমিককে বরখাস্ত করে ইংরেজ সরকার। তাদের প্রতিও সমর্থন জানাতে এগিয়ে আসেননি মহাত্মা গান্ধী। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এটা এক কালো অধ্যায় বলা যায়। বা ঘুরিয়ে বলা যায় শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনকে অস্বীকার করেছিলেন ভারতের বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী নেতারা।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,808FansLike
19FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!