১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১রবিবার

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১রবিবার

বাবার নজর এড়িয়ে বন্দুকের নলে মদ খেতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল সম্রাট আকবরের এই সন্তানের

রাজরাজড়ারা যেমন বিচিত্র সব বিলাস-ব্যসনে নিজেদের ডুবিয়ে রাখতেন তেমনই তাদের কিছু বিদঘুটে স্বভাবের জন্য অনেক সময় ভয়ঙ্কর বিপদ এগিয়ে আসত। মূলত বিচিত্র সব শখ থেকেই এই বিপদের সূত্রপাত হত। এর ফলে অনেক সময় প্রাণহানি পর্যন্ত হয়েছে।

 

মুঘল আমলের সেরা শাসক হিসেবে বিবেচিত করা হয় আকবরকে। ইতিহাস বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ তুলে ধরে দেখিয়ে দিয়েছে তিনি একজন সুযোগ্য শাসক ছিলেন। এমনকি তার শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবেশ যথেষ্ট পরিমাণে রক্ষিত হয়েছিল। তিনি হিন্দুদের উপর থেকে বেশকিছু নিপীড়নমূলক কর প্রত্যাহার করে নেন। নিজেও হিন্দু রমণীকে বিবাহ করেন, এমনকি প্রাসাদের ভেতর হিন্দু মন্দির পর্যন্ত স্থাপন করেছিলেন।

আরও পড়ুন
কন্ডোম দিয়ে মেরামত করা কায়াকের সাহায্যে সোনা জিতলেন প্রতিযোগী

বাবার নজর এড়িয়ে বন্দুকের নলে মদ খেতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল সম্রাট আকবরের এই সন্তানের
সম্রাট আকবর, ছেলেবেলা থেকেই যার জীবন ছিল প্রতিকূলতায় ভরা

 

আকবর অতি নিষ্ঠুরতার সঙ্গে গোটা দেশ শাসন করেছেন এইরকম উদাহরণ পাওয়া যায় না। বরং তিনি প্রজাপালক হিসেবে যথেষ্ট সুখ্যাতি অর্জন করেন। কিন্তু যিনি এত সুযোগ্য শাসক ছিলেন তিনি আদৌ পিতা হিসেবে কতটা সফল ছিলেন তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। প্রধান তিন পুত্র সেলিম, মুরাদ এবং দানিয়েল তিনজনেই বিপথে চালিত হয়। তার মধ্যে মুরাদ এবং দানিয়েলের অকাল মৃত্যু ঘটে। সেলিম পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীর নাম নিয়ে মুঘল ভারতের শাসন ক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত হন।

 

ঐতিহাসিকরা জানান তিন পুত্রের সঙ্গেই আকবরের খুব একটা সুসম্পর্ক ছিল না। বরং তিনি একসময় ভাবনাচিন্তা শুরু করেছিলেন নাতিদের মধ্য থেকে কাউকে পরবর্তী মুঘল সম্রাট নির্বাচিত করে যাবেন। নাতিদের মধ্যে মূলত খসরু এবং খুররমের ওপর সবচেয়ে বেশি আস্থা ছিল তার। জাহাঙ্গীরের এই দুই সন্তানকে নিজের কাছে এনেও রেখেছিলেন আকবর।

আরও পড়ুন
প্রথমবার কৃষ্ণ গহ্বরের শেষ খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা

বাবার নজর এড়িয়ে বন্দুকের নলে মদ খেতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল সম্রাট আকবরের এই সন্তানের
আকবরের কনিষ্ঠ সন্তান শাহজাদা দানিয়েল

 

তবে তিন পুত্রের মধ্যে কনিষ্ঠ দানিয়েল প্রথমদিকে আকবরের বিশেষ পছন্দের ছিলেন। কিন্তু সৌখিন ও খামখেয়ালি হিসেবে পরিচিত দানিয়েলের উপরেও শেষ দিকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মহামতি আকবর। এমনকি সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে একসময় তার বিরুদ্ধে গুপ্তচর পর্যন্ত নিযুক্ত করেন তিনি। বলা যেতে পারে দানিয়েলকে একসময় নজরবন্দি করে ফেলেছিলেন। যদিও তার অকাল মৃত্যু ঠেকাতে তিনি ব্যর্থ হন।

 

১৫৭২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আজমিরের সুফি-সাধক শেখ দানিয়েলের বাসগৃহে জন্ম হয় আকবরের কনিষ্ঠ সন্তানের। সুফি সাধকের নামানুসারেই দানিয়েল মির্জার নামকরণ হয়। তবে ছোট থেকেই সুন্দর ঘোড়ার প্রতি বিশেষ আসক্তি ছিল আকবরের এই কনিষ্ঠপুত্রের। ভালমানের ঘোড়ার সন্ধান পেলেই উচ্চমূল্য দিয়ে তা কিনে নিতেন তিনি। পরবর্তীকালে ছয় হাজার সৈন্যের মনসবদার‌ও নিযুক্ত হন।

 

আকবর দাক্ষিণাত্য অভিযানে গেলে দানিয়েল তার সঙ্গী হয়েছিলেন। দাক্ষিণাত্য জয় করার পর কনিষ্ঠপুত্র দানিয়ালকে সেখানকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। এর ফলে বাদশার নজরের বাইরে চলে যান তিনি। এই ঘটনাই আকবরের কনিষ্ঠ পুত্রের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়। তিনি শাসক হিসেবে চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছিলেন। কারণ দক্ষিণাত্যে গিয়ে দানিয়েল পুরোপুরি মদের নেশায় ডুবে যান। সারাদিন মদের নেশায় চুর হয়ে থাকায় দক্ষিণাত্যে প্রবল বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। স্বাভাবিকভাবেই এই খবর আকবরের কানে পৌঁছলে তিনি তৎক্ষণাৎ কঠোর হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একাধিক পদক্ষেপ নেন। দানিয়েলকেই দক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা রেখে দিলেও তার সভাসদদের অনেকেই বদলে দেন তিনি। এর পাশাপাশি দিল্লি থেকে বাছাই করা গুপ্তচরদের পাঠিয়েছিলেন সেখানে, যাতে তার কনিষ্ঠপুত্র কোনভাবেই আর মদের নাগাল না পান। সে জন্য কঠোর নজরদারি চালানো শুরু হয়। এমনকি দানিয়েলের ঘনিষ্ঠরাও আর তার কাছে মদ পৌঁছে দিতে পারেনি।

আরও পড়ুন
তারকেশ্বরের মন্দিরেই হয়েছিল বাংলায় প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন,যোগ দিয়েছিলেন বারবণিতারাও

বাবার নজর এড়িয়ে বন্দুকের নলে মদ খেতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল সম্রাট আকবরের এই সন্তানের
ফতেপুর সিক্রিতে আকবরকে স্বাগত জানাচ্ছেন তার তিন সন্তান

 

দাক্ষিণাত্যে দানিয়েলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনুচর ছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ, ইনি অবশ্য বাংলার প্রাচীন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ নন। এই ব্যক্তি সবরকমভাবে দানিয়েলকে মদত দিলেও তার মদের নেশা পছন্দ করতেন না। কিন্তু মদের যোগান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে প্রায় উন্মাদে পরিণত হন আকবরের কনিষ্ঠ পুত্র। শেষ পর্যন্ত তার এই প্রিয় অনুচরকে জানান শেষবারের মতো একবার মদ পান করতে চান। এইজন্য তার একটি প্রিয় বন্দুক মুর্শিদকুলি খাঁর হাতে তুলে দেন। এই বন্দুকের নলেই মদ ভরে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন দানিয়েল।

 

বাধ্য অনুচর মুর্শিদকুলি খাঁ রাজপুত্রের আদেশ শুনে বন্দুকের নলে করে মদ এনে দেন। কিন্তু বন্দুকের নলে লেগে থাকা বারুদ ওই মদের সঙ্গে মিশে বিষক্রিয়া ঘটায়। সেই মদ পান করার কিছু সময় পরই শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় দানিয়েলের। শত চেষ্টা করেও তার প্রাণ বাঁচাতে ব্যর্থ হন চিকিৎসকরা। ১৬০৪ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে মৃত্যু হয় আকবরের এই কনিষ্ঠ পুত্রের।

আরও পড়ুন
কুয়ো খুঁড়তে গিয়ে পাওয়া গেলপৃথিবীর সর্ববৃহৎ নীলকান্তমণির স্তূপ

বাবার নজর এড়িয়ে বন্দুকের নলে মদ খেতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল সম্রাট আকবরের এই সন্তানের
শাহজাদা দানিয়েল, দাক্ষিণাত্য অভিযানের সময়

এক্ষেত্রে বলাই যায় দানিয়েল মির্জার বিচিত্র শখ তার মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছিল। তার সম্বন্ধে বড়ো ভাই সেলিম তথা পরবর্তী মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনীতে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তা থেকে বোঝা যায় ছোট ভাইয়ের সঙ্গে খুব একটা সদ্ভাব না থাকলেও তার প্রতি যথেষ্ট স্নেহ ছিল জাহাঙ্গীরের।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,808FansLike
19FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!