৪ আগস্ট, ২০২১বুধবার

৪ আগস্ট, ২০২১বুধবার

শরীরজুড়ে রাম নামের উল্কি, বর্ণহিন্দু অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শরীরে প্রাচীন ইতিহাস বহন করে চলেছে এই ভারতীয় সম্প্রদায়

পুরুষোত্তম রামের নাম সারা শরীরে বয়ে নিয়ে বেড়ায় এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা। একটি দুটি নয়, বরং হাজার হাজার রাম নামের উল্কি এদের শরীরকে ঘিরে আঁকা থাকে। এমনকি চুল কামিয়ে মাথাতেও রামের নাম লিখে রাখেন রামনামী সম্প্রদায়ের মানুষেরা। রামই তাদের একমাত্র উপাস্য। তাদের পুরো শরীর আসলে রামের মন্দির।

 

ভারতীয় মহাকাব্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে, পুরুষোত্তম রাম বনবাসকালে সমাজে অপাংক্তেয় গোষ্ঠীগুলির মানুষজনকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। তিনি মানবিকতার প্রতীক। সমাজের সংকীর্ণ জাতিভেদের ঊর্ধ্বে তিনি মানবধর্মের সাম্যতার দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছিলেন। তাই সমাজে অবহেলিত রামনামীরা একসময় সেই রামচন্দ্রকেই তাঁদের আরাধ্য হিসেবে স্থান দিয়েছিলেন নিজেদের শরীরে, মনে এবং সংস্কৃতিতে।

আরও পড়ুন
মিশরের রহস্যময়ী রানী ক্লিওপেট্রার মমির সন্ধান করতে গিয়ে মিলল সোনার জিভ‌ওয়ালা ১৬ টি মমির

শরীরজুড়ে রাম নামের উল্কি, প্রাচীন ইতিহাস শরীরে বহন করে চলেছে এই ভারতীয় আদিবাসী সমাজ
রামচন্দ্রকেই তাঁদের আরাধ্য হিসেবে স্থান দিয়েছিলেন নিজেদের শরীরে, মনে এবং সংস্কৃতিতে

হাওয়াই ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রামদাস লাম্ব রামনামী সম্প্রদায়কে নিয়ে লিখেছিলেন ‘The Ramnamis Ramnam, and Untouchable Religion in Central India’ বইটি। বইটি এই সম্প্রদায়ের ব্যাপারে জানার জন্য একটি আকর গ্রন্থ। এক সময়ে এই জনজাতির মানুষরা ছিলেন পেশাগতভাবে চর্মকার; বহুকাল থেকেই এরা পশুর চামড়া ছাড়িয়ে সেই চামড়া দিয়ে নানান জিনিস তৈরি করত। কিন্তু পরে তারা চর্মকারবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে চাষবাস, মৃৎশিল্প ও ধাতুশিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়।

 

রামদাসের বই থেকে জানতে পারা যায়, রামনামীদের দাবিয়ে চিরকালই দাবিয়ে রেখেছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজ।  মন্দিরে কোনোরকম প্রবেশাধিকার ছিল না তাদের। এমনকী তাদের দোকান-বাজারও ছিল আলাদা। সমাজে তাদেরকে চলতেও হত অন্য রাস্তা দিয়েই; শুধু তাই নয় এই সমাজের মানুষদের অধিকার ছিল না রামায়ণ পাঠেরও। ১৮২০ সাল নাগাদ ছত্তিশগড়ে গুরু ঘাসিদাস শুরু করেছিলেন ‘সতনামী’ আন্দোলন। সেই আন্দোলনের পরোক্ষ‌ প্রভাবেই বর্তমানে তারা চর্মকারবৃত্তিকে পরিত্যাগ করে বেরিয়ে এসেছিল এরা।

আরও পড়ুন
মিশরে যৌনকর্মী নয় আছে গ্রীষ্মকালীন স্ত্রী, টাকা দিয়ে কেনা স্ত্রীয়ের মেয়াদ থাকে মাত্র দশ কুড়ি দিন

শরীরজুড়ে রাম নামের উল্কি, প্রাচীন ইতিহাস শরীরে বহন করে চলেছে এই ভারতীয় আদিবাসী সমাজ
রামনামীদের দাবিয়ে চিরকালই দাবিয়ে রেখেছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজ

যদিও রামনামী সম্প্রদায়ের প্রাণপুরুষ ছিলেন পরশুরাম। ছত্তিশগড়ের ছারপোড়া গ্রামে ১৮৭০ সালে তাঁর জন্ম হয়। তিনিই প্রথম বর্ণহিন্দুদের তাচ্ছিল্যের প্রতিবাদে সারা শরীরে রামনাম লিখিয়েছিলেন। ১৮৯০ সালে তিনি তাঁর কপালে লিখিয়েছিলেন রামের নাম। রামনামীদের পথপ্রদর্শক ছিলেন তিনিই। তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বহু অন্ত্যজ মানুষ এই সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে পরে শুধু অন্ত্যজ মানুষেরাই নন, ব্রাহ্মণ, বণিক, কুর্মিসহ অন্যান্য জাতির মানুষেরাও যুক্ত হয়ে যান রামনামীদের সঙ্গে।

 

এই সম্প্রদায়ের শরীরে রামনামের উল্কি আঁকা নিয়ে ভিন্ন আরেকটি মতও প্রচলিত রয়েছে। সম্প্রদায়ের কেউ কেউ মনে করেন, হিন্দুদের দ্বারা অবহেলিত এই সম্প্রদায়ের মানুষদের মুঘলরা নিজেদের ধর্মে টেনে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যারা মনেপ্রাণে নিজেদের সঁপে দিয়েছিলেন প্রভু শ্রীরামের কাছে তারা ধর্মান্তরিত হবেন কীভাবে; তাই তারা শরীরে উল্কি আঁকতে শুরু করেন। যদিও এই মতের স্বপক্ষে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে না। বরং রামদাস মনে করেছেন, কবীরের ভক্তি আন্দোলনের একটা প্রভাব এদের মধ্যে কাজ করেছিল।

আরও পড়ুন
সাত দশক আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পাখির দেখা মিলল সিঙ্গাপুরে

শরীরজুড়ে রাম নামের উল্কি, প্রাচীন ইতিহাস শরীরে বহন করে চলেছে এই ভারতীয় আদিবাসী সমাজ
চুল কামিয়ে মাথাতেও রামের নাম লিখে রাখেন রামনামী সম্প্রদায়ের মানুষেরা

রামনামী সম্প্রদায়ের মানুষেরা শুধু শরীরে উল্কি আঁকেন তাই নয়, বাড়ির দেওয়ালে কালো রঙে রামের নাম লিখে রাখেন এবং রামনামের চাদর গায়ে জড়িয়ে থাকেন। তারা মনে করেন প্রভু রাম এভাবেই সারাক্ষণ তাদের ঘিরে থাকেন। রামের নামকে এভাবে ব্যবহার করার জন্য ক্ষুব্ধ হয়ে বর্ণহিন্দুরা এদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই মামলায় জিতে যান রামনামীরাই।

 

যেহেতু তাদের শরীরই তাদের রামের মন্দির, তাই নিজেদের পবিত্র রাখতে ধূমপান বা মদ্যপান করেন না এই সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রত্যেকদিন নিয়ম করে রামনাম জপ করেন। এমনকি তাদের নামের মধ্যেও রাম শব্দটি থাকা বাধ্যতামূলক। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে ইদানিং পুরো শরীরে রামনাম লেখার চল উঠে গেছে। তবে যারা পুরো শরীরে রামনাম লিখে থাকেন, তাদের ‘পুর্ণনাকশিক’ বলা হয়। এখন এই সমাজে গেলে দেখা যাবে ‘পুর্ণনাকশিক’রা সকলেই প্রায় সত্তর বছরের ঊর্ধ্বে। যদিও রামনাম একেবারেই মুছে ফেলেনি নবীন প্রজন্ম। এখনও দু’বছর বয়স হওয়ার আগেই শিশুদের বুকে এঁকে দেওয়া হয় রামের নাম।

আরও পড়ুন
ভারতের একমাত্র আইনজীবী যিনি সংস্কৃত ভাষাকে বাঁচাতে আদালতে সওয়াল জবাব করেন এই ভাষায়

শরীরজুড়ে রাম নামের উল্কি, প্রাচীন ইতিহাস শরীরে বহন করে চলেছে এই ভারতীয় আদিবাসী সমাজ
‘পুর্ণনাকশিক’রা সকলেই প্রায় সত্তর বছরের ঊর্ধ্বে

গ্রামে রামনামীদের গ্রামে প্রার্থনা করার জন্য একটি করে ঘর থাকে; সেটাই তাদের মন্দির। সেই মন্দিরে রাখা থাকে তুলসীদাসের রামচরিতমানস। সেটিকেই তারা ধর্মগ্রন্থ বলে মনে করেন এবং ওটিই তাদের কাছে দেববিগ্রহ। সাধারণত ছত্তিশগড়ের রাজগড়, জাঞ্জগির-চম্পা, বিলাসপুর ইত্যাদি জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত মহানদীর ধারে ধারেই রামনামীদের গ্রামগুলি দেখতে পাওয়া যায়। তবে ইদানিংকালে শুধু ছত্তিশগড়েই নয়, বরং মহারাষ্ট্র, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের গ্রামেও রামনামীদের দেখা মেলে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,808FansLike
19FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!