১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

লোকজীবনে প্রচলিত এই ধরনের গল্পকথা পাকেপ্রকারে বিদ্বজ্জনরাও একেবারে খারিজ করতে পারেন না

মহারাষ্ট্রীয় সন্তকবিদের অন্যতম গোরা কুম্ভার ছাড়াও অতিশূদ্র মহার জাতির মানুষ চোখামেলার প্রসঙ্গেও আগের দু-টি পর্বে আলোকপাত করা হয়েছে। এমনকী ব্রাহ্মণ বংশজাত হয়েও কেন প্রান্তিক জীবন কাটিয়েছিলেন জ্ঞানদেব ও তাঁর ভাইবোনরা, সেকথাও বলা হয়েছিল। আর সেইসঙ্গে সাওতা মালীর রচনা অবলম্বনেও আলোচনা এগিয়েছে। এবারেও তাঁর প্রসঙ্গ বাদ যায়নি, সেইসঙ্গে রয়েছে নামদেবের কথাও। সন্তদের যাপনেরই ফসল তাঁদের বচনগুলি কীভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধী স্বর হয়ে উঠেছে, সেইটিই পরখ করে দেখেছেন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সন্তজনের মুক্তধারায় ধারাবাহিকে এবার একাদশ পর্বের আলোচনায়।

 

সাওতা মালীর নাম আর রচনার সঙ্গে পাঠকের প্রথম সাক্ষাৎ পঞ্চম পর্বে বিট্‌ঠলের মূর্তি প্রসঙ্গে আলোচনায়, তার পর দশম পর্বে। তাঁর প্রসঙ্গে আরও দু-এক কথা এখানে বলে নিয়ে অন্য কথায় যাব।
বারকরীরা নিজেদের বিচারমতো সাওতা মালীকেও জ্ঞানদেব ( ১২৭১ বা ১২৭৫-৯৬) আর নামদেবের ( ১২৭০-১৩৫০) সমসাময়িক মনে করেছেন। অর্থাৎ তেরো শতকের মানুষ ছিলেন সাওতা মালী (১২৫০-৯৫), বছর পঁয়তাল্লিশের আয়ু নিয়ে। বলা হয়, সাওতা মালীর ঠাকুরদা দেবু মালী সোলাপুরের আরনগাঁও বা আরনভেন্ডিতে এসে বসত করেন। তাঁর দুই ছেলে পরশু আর ডোঙরের ভেতর দ্বিতীয় জন অল্পবয়েসেই গত হয়। পরশুর সঙ্গে বিয়ে হয় নঙ্গিতাবাইয়ের, তাঁদেরই সন্তান সাওতা। দরিদ্র এই পরিবারের ধর্মীয় আশ্রয় ছিল ভাগবতসমাজে। ফলে ছোটো থেকেই বৈষ্ণব আবহাওয়ায় বড়ো হয়েছেন সাওতা। তাঁর বিয়েও হয় কাছাকাছি অঞ্চলের সেরকমই এক পরিবারের মেয়ে জনাবাইয়ের সঙ্গে। ভক্তিমান সাওতা নিজের বাগানের পরিচর্যাতেই ব্যস্ত থাকতেন। সে-ই ছিল তাঁর নিত্যদিনের ধর্মচর্চা।

 

বারকরীদের বিশ্বাস, জ্ঞানদেব আর নামদেব একসঙ্গে পনঢরপুরের উদ্দেশে বার্ষিক তীর্থযাত্রায় শামিল হয়েছিলেন। ওই যাত্রার সময় তাঁরা সাওতা মালীর বাড়ির কাছাকাছি রাস্তা ধরে যান এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের মানসে সেখানে উপস্থিত হন। বাগানের মাটি কামড়ে এমনই পড়ে থাকতেন, যে, তীর্থযাত্রার ফুরসতও জোটেনি সাওতার জীবনে। দেবতা বিট্‌ঠল বা পাণ্ডুরঙ্গ তাই ভক্তর বাগানে এসে সাওতাকে দর্শন দেন। সেই সময় ওই তীর্থযাত্রীরাও উপস্থিত বাগানের বাইরে। এই লোককথাই একটি অভঙ্গর স্বল্পায়তনে ধরা আছে।

আরও পড়ুন
এই যে জাতি বিচার করে দেবস্থানে প্রবেশের অধিকার, বর্ণবিভক্ত ভারতীয় সমাজে এটাই দীর্ঘকালের রীতি, ব্রাহ্মণ্যবাদের ফসল

সাওতা মালীর স্মারকমন্দিরে তাঁর মূর্তি, আরন, সোলাপুর

এ-গল্প যথেষ্ট প্রচারিত বারকরীসমাজে। আর সেই প্রচারের দরুনই হোক বা অন্য কোনো কারণে, সাওতার প্রত্যেক মৃত্যুবার্ষিকীতে পনঢরপুর থেকে বিট্‌ঠলের পালকি আসে আরনে। সাধারণভাবে বারকরী সন্তদের যার যার নিজের জায়গা থেকে সব পালকি যখন পনঢরপুরগামী হয়ে থাকে, একাদশী তিথি বা নিজেদের বিশেষ পার্বণ উপলক্ষ্য করে, তার ব্যতিক্রম ঘটে ভক্ত সাওতার ক্ষেত্রে।
জ্ঞানদেব আর নামদেব ছাড়াও বাগানে পাণ্ডুরঙ্গর উপস্থিতি প্রসঙ্গে সাওতার সেই অভঙ্গয় কী বলা হয়েছিল দেখে নেওয়া যাক।

 

তিনি বলছেন— ‘বিকাসিলে নয়ন স্ফুরণ আলে ৰাহী। দাটলে হৃদয়ী করুণা-ভরিতেঁ॥ জাতাঁ মার্গী ভক্ত সাবতা তোঁ মালী। আলা তয়া জবলী পাণ্ডুরঙ্গ॥’ যার অর্থ, ‘ফুটল নয়ান, ছড়াল দু-হাত,/ করুণায় ঘন হয়ে আছে মন।/ সাওতা মালীর পথ দিয়ে যায় ভক্ত যখন,/ পাণ্ডুরঙ্গ এসেছে তখন’,

 

এর পর বলা হচ্ছে— ‘নামা জ্ঞানদেব রাহিলে ৰাহেরী। মালিয়া ভীতরী গেলা দেব॥’ অর্থাৎ, ‘নামদেব আর জ্ঞানদেব থাকে বাইরে, / দেবতা আসেন বাগানে যখন— ’
তারপর কী হল? ‘মাথা ঠেউনি হাত কেলা সাবধান। দিলেঁ আলিঙ্গন চহূঁ ভুজীঁ॥’— ‘মাথার উপর হাত রেখে তাঁর আশীর্বচন, / চার বাহু ঘিরে দিলেন আলিঙ্গন।’

আর তখনই, ‘চরণী ঠেউনি মাথা বিনবিতো সাবতা। ৰৈসা পংঢরীনাথা করীন পূজা॥’ যার অর্থ, ‘সাওতা যে তাঁর পায়ে মাথা রেখে / বলে অনুনয় করে— /পনঢরীনাথ বসলে এখানে /দেব তাঁকে পূজা ধরে।’

 

নামদেব এবং জ্ঞানদেবের সমসাময়িকতার প্রমাণ বলেও কেউ কেউ একে মনে করেছেন। লোকজীবনে প্রচলিত এই ধরনের গল্পকথা পাকেপ্রকারে বিদ্বজ্জনরাও একেবারে খারিজ করতে পারেন না। ভক্তদের সম্পর্কে চালু এরকম বহু জনশ্রুতিই তাঁদের জীবনী রচনার উপাদান হয়েছিল সতেরো-আঠারো শতকে বিভিন্ন চরিতলেখকের কাছে। আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য বোঝাতেই সেসবের অবতারণা হলেও, সন্তরা কখনো ‘চমৎকার’ প্রদর্শনের পথে হাঁটেননি, বরং তার বিরুদ্ধেই ছিলেন। সাধারণ মানুষের জাদুবিশ্বাসী মনকেও তাঁরা প্রশ্রয় দেননি।

আরও পড়ুন
বারকরী সন্ত হয়ে ওঠার আগে গোরা নাকি নামদেবকে পরীক্ষা করে বুঝেছিলেন পাত্রটি পুড়ে তেমন পাকা হয়নি

নিজের বাগানে ভক্ত সাওতা মালী, চিত্রকরের কল্পনায়

সাওতার সেই বাগান, বা জন্ম-কর্ম সবই ছিল বর্তমানে সোলাপুর থেকে প্রায় ষাট-পঁয়ষট্টি কিলোমিটার দূরত্বে, সোলাপুর-পুনে মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকা আরন বা আরনভেন্ডিতে। সেখানে তাঁর সমাধিমন্দিরও আছে। বারকরীদের কাছে সেও আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

 

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বারকরীসমাজে ওই গল্প চালু থাকার উৎসে কি পনঢরপুরের বিট্‌ঠলমন্দিরে সাওতার প্রবেশাধিকার না পাওয়ার কোনো কারণ থাকতেও পারে? না কি তাঁর আপনকাজে নিষ্ঠার প্রমাণ স্বরূপ, বা ভক্তের মহিমা হিসেবে তা প্রচারের লক্ষ্যে হয়ে থাকবে? এর উত্তর পাওয়া সহজ নয়। তাঁর রচনার সাক্ষ্যে একটা অনুমান বড়োজোর করা যেতে পারে। কিন্তু সেইসঙ্গে মনে রাখতে হয়, বিট্‌ঠলের বিগ্রহের বর্ণনায় তাঁর সেই বিশিষ্ট উল্লেখের কথাও— ‘হৃদয়কমল মন্ত্রসিদ্ধ’। ষড়াক্ষরী সেই মন্ত্র ‘শ্রীকৃষ্ণায় নমঃ’,যা মূর্তির গলার নীচ থেকে বুক অবধি ত্রিকোণাকারে কূটভাষায় উৎকীর্ণ ছিল। অন্য কারও বিবরণে তা না পাওয়ার কারণেই দুর্লভ। পনঢরপুরের মন্দিরে যে-বিগ্রহ বর্তমানে রয়েছে , তাতে দেখা না গেলেও সোলাপুর জেলার মাঢ়ে অঞ্চলের মন্দিরে বিট্‌ঠলমূর্তিতে যা স্পষ্টই লক্ষ করা যায়। যা ইতিহাসাচার্য বিশ্বনাথ কাশীনাথ রাজওয়াড়ে লক্ষ করে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তাঁর এক প্রবন্ধে (১৯০৫)। তাহলে মূলমন্দিরে না গিয়ে থাকলে সাওতা ওই বিবরণই-বা দিলেন কী করে? অন্য কোথাও দেখেছিলেন? এ-প্রশ্নও তো সেইসঙ্গে উঠে আসে।

আরও পড়ুন
গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির নিগ্রহ থেকে বাঁচতেই সংকেতলিপি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন মহানুভবরা

নামদেবের মর্মরমূর্তি, শেগাঁও, বুলদানা

যাই হোক, আগের পর্বেই উল্লেখ করা হয়েছিল সাওতার গুরুত্বপূর্ণ সেই কথাগুলি, ‘পেঁয়াজ, মুলো, সবজিশাকে/ আমার বিঠোবাই যে থাকে।/ লঙ্কা, রসুন, ধনের সারি— /তার মাঝে সেও রয় আমারই’, এ তো পরিষ্কার সেই সর্বাস্তিবাদীর বক্তব্য। বিশ্বের অণু-পরমাণুতেও যে-পরম বিরাজ করছেন, সেই তিনিই সাওতার বাগানে উৎপন্ন ফসলেও রয়েছেন। তাঁরই সঙ্গে বসবাস করছেন সাওতা। তাহলে আর তীর্থযাত্রার প্রয়োজন কোথায়? এখানেই তো তাঁর তীর্থ-মূর্তি দুয়েরই সাক্ষাৎ ঘটছে। বলা হচ্ছে যদিও ‘আমার বিঠোবাই যে থাকে’, কিন্তু তা মূর্তির সীমা ছাড়িয়ে ভক্তের ‘অন্তরতর সে’। পাঠক, এসব মনে রেখেই এগোতে হবে আমাদের।

 

আরও লক্ষ করতে হয় তাঁর সেই অভঙ্গে, যেখানে উচ্চকুলে জন্ম না হওয়ার দরুন সরাসরি বলছেন, ‘এই ভালো বেশ ছোটোজাত আছি— /মহান হতে যে বাড়াবাড়ি নেই,/ ব্রাহ্মণ হয়ে জন্মাতে হলে/ জুটত অনেক কর্ম তো সেই।/ নেই স্নান, নেই সন্ধ্যাহ্নিক, / নেই সংস্রব জাতকুলে যার, / ছোটোজাত এই সাওতা বলছে— / কৃপা চাই শুধু শ্রীপতি তোমার।’ তাহলে ভক্ত সাওতার দিক থেকে কি পালটা হিসেবেই একে দেখব না আমরা? ওহে ব্রাহ্মণ, উঁচু বংশের লোক, তু্মি আমায় প্রত্যাখ্যান করলে, মন্দিরে যদি ঢুকতে না-ই দিলে, ভগবানকে তুমি মন্দিরে আটকে রাখতে পারবে কি? তিনি ‘রৌদ্রে-জলে আছেন সবার সাথে’, যারা ‘খাটছে বারো মাস’। ‘নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে— দেবতা নাই ঘরে।’ তিনি রয়েছেন ‘ধুলামন্দির’এ। আধুনিক যুগের কবির এই কথাটাই কি আরেকভাবে ফুটে উঠছে না প্রাচীন সাওতা প্রসঙ্গে ওই বারকরী লোককথায়? কী মনে হয়?

আরও পড়ুন
বীরশিলা পুজোর সাবেক প্রকরণ বদলে যায় তাকে মানবিক অবয়ব দানের পর

নামদেবমন্দিরে কলসারোহণ, নরসি, হিঙ্গোলি

প্রসঙ্গত, আগের পর্বে আমাদের আলোচনায় মহার সম্প্রদায়ের ভক্ত চোখামেলার কথা সূত্রে তাঁর কয়েকটি রচনাও পাঠকের গোচরে আনা হয়েছিল। কিন্তু অতিশূদ্র চোখামেলাই নন শুধু, শিম্পি বা দরজির সন্তান শূদ্র নামদেবও বিট্‌ঠলমন্দিরের ব্রাহ্মণ পূজারি ‘বড়বা’দের প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর এক রচনায় সে-প্রসঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেটি এখানে আমাদের আলোচনাক্রমে উল্লেখের আগে বলে রাখা ভালো, নামদেবের রচনা কেবল মারাঠিতেই নয়, হিন্দুস্তানি ভাষাতেও পাওয়া গেছে। আর সে-সংখ্যাও খুব কম নয়। তার ভেতর ষাট-একষট্টির মতো সংগৃহীত হয়েছিল শিখ সম্প্রদায়ের পঞ্চম গুরু অর্জনদেব (১৫৬৩-১৬০৬) সংকলিত ‘আদিগ্রন্থ’ (১৬০৪) বা ‘গুরুগ্রন্থসাহেব’এ। তার বাইরেও বিস্তর রয়ে গেছে। সেসব থেকেই আড়াই-শোর বেশি সংকলিত হয়েছিল আধুনিক বিদ্বজ্জনের সম্পাদনায় ১৯৮৯ সালে। অবশ্য তার আগেও সংগৃহীত হয়েছিল। কিন্তু সেসবে সম্পাদনার ছোঁয়া কতটা ছিল তা প্রশ্নসাপেক্ষ। যাই হোক, এখানে নামদেবের সেই অভিজ্ঞতার বয়ান দেখে নেওয়া যাক। ভাষাটি লক্ষণীয়, নামদেব বলছেন—
‘হীন দীন জাত মোরী পংঢরীকে রায়া। ঐসা তুমনে নামা দরজী কায়কু ৰনায়া॥ / টাল ৰিনা লেকে নামা রাউল মে গয়া। পূজা করতে ৰহ্মন উনৈন ৰাহের ঢকায়া॥’ যার অর্থ— ‘অধম অভাবী ঘরে,পনঢরীরায়, / দরজি করে পাঠালে গো কেন এ নামায়?/ করতাল বীণা নিয়ে দেউলে যখন/ সে গেছে, খেদায় তাকে পূজারি ব্রাহ্মণ।’

 

এর পর বলছেন— ‘দেবল কে পিছে নামা অল্লক পুকারে। জিদর জিদর নামা উদর দেউলহিঁ ফিরে॥’ — ‘হে অলখ, বলে গিয়ে দেউলের পাছে, / দেউলও সেদিকে ফেরে ‘নাম’ যেথা আছে।’ পঙ্‌ক্তিটির যা তাৎপর্য, তা স্বচ্ছ দৃষ্টিতে আজকের দিনে যেভাবে গ্রহণ করব আমরা, সেভাবে কিন্তু করা হয়নি এককালে। বরং ‘মন্দির ঘুরে যাওয়া’র বিষয়টি অলৌকিক হিসেবেই নামদেবের চরিতলেখায় দেখা হয়েছিল।

আরও পড়ুন
সুলতানি আমলে পনঢরপুরের দেবস্থানেও নাশকতার আশঙ্কা কিছু কম ছিল না

নির্মাণপর্বে নামদেবমন্দির, নরসি, হিঙ্গোলি

যাই হোক, এর পরে নামদেব বলছেন— ‘নানা ৰর্ণ গবা উনকা এক ৰর্ণ দূধ। তুম কহাঁ কে ৰহ্মন হম কহাঁ কে সূদ॥’ পরিষ্কার জাতি-বর্ণের শ্রেষ্ঠতার দাবির বিরুদ্ধে সন্তজনের ক্ষুব্ধ মন্তব্য। এই একই উপমা কবীরের বক্তব্যে যেমন পাওয়া যাবে, তেমনই অন্যান্য সন্তদের বচনেও। উপমার এই জাতীয় ব্যবহার তাঁদের রচনায় ঘুরে-ফিরে আসে, যাকে বলে পৌনঃপুনিক। — ‘বহুবর্ণ গাই, তবু দুধ একই সেই, / কী করে বাউন তুমি, আমি শূদ্র এই?’

 

নিজের দরজি পরিচয়ের সূত্রেই শেষে উপমাটি লক্ষ করার মতো— ‘মন মেরী সুঈ তনো মেরা ধাগা। খেচরজী কে চরণ পর নামা সিংপী লাগা॥’ অর্থাৎ ‘সুচ হলে মন আমার, সুতো দেহটাকে/ খেচরচরণে রেখে নামা শিম্পি থাকে।’ দেহ-মন সবই তাঁর গুরু বিসোবা খেচরের পায়ে সমর্পণ করে তাঁরই আশ্রিত হয়েছেন দরজির ছেলে নামদেব। সন্তদের রচনা, সে উত্তর ভারতীয়ই হোক, কি দক্ষিণাংশের মহারাষ্ট্রীয়ই হোক, সামগ্রিকভাবে যে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধী, তা এই ক্ষুদ্র উদাহরণেও স্পষ্ট হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
তাহলে এ কেমন স্বরূপপ্রকাশ যাঁর বিগ্রহের সঙ্গে অন্য কোনো বৈষ্ণব মূর্তির সাদৃশ্য নেই?

ঔণ্ঢ নাগনাথ মন্দির, নরসি

সন্তদের জীবিকার অনুষঙ্গ নানাভাবেই পাওয়া যাবে তাঁদের রচনায়। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক— যেদিক থেকেই দেখা হোক-না-কেন, প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। সন্তসাধনা সংসারবিবাগী সন্ন্যাসীর মতো না হওয়ার কারণেই, তাঁদের স্বকীয়তাও সেই জীবন-জীবিকার টানা-পোড়েনেই বোনা হয়েছিল। আরও অনেকের প্রসঙ্গ এলে, সেসব ক্ষেত্রেও তা দেখা যাবে।

(পরবর্তী অংশ আগামী রবিবার)

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
কবি, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও গ্রন্থ-সম্পাদক। উল্লেখযোগ্য বইগুলি: কবিতা : 'সমাচার দর্পণ', 'মায়াবন্দর', 'খণ্ডিত শ্লোকের দিনে', 'চন্দ্ররেখার সনেট', 'ছিন্ন ডুরি জোড় দিয়ে'। গদ্য: 'কলকাতার রঙ্গিণীকথা'। অনুবাদ : 'কবীর ও তাঁর কবিতা', 'কবীর-বীজক ও অন্যান্য কবিতা'। সম্মাননা : পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি-র লীলা রায় স্মারক পুরস্কার (২০০২), সাহিত্য অকাদেমি অনুবাদ পুরস্কার (২০০৫)

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,820FansLike
20FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!