১৩ জুন, ২০২১রবিবার

১৩ জুন, ২০২১রবিবার

কলকাতার একটি অঞ্চলের নাম এই মাছের নামে, কালের ফেরে সেই মাছেরাই হারিয়েছে অস্তিত্ব

বাঙালি তাও আবার কলকাত্তাইয়া বাঙালি মাছ খাবে না তা আবার হয় নাকি। আর মাছের বাজারের নামের সঙ্গে কলকাতার কোনো অঞ্চলের নামকরণ হবে এ আর এমনকী।কলকাতাতেই তো আছে মেছুয়া বাজার, বা এরকম বেশকিছু জায়গা। কিন্তু জায়গায় নামকরণ যদি হয় মাছের নামে, তাহলে একটু অবাক লাগে বৈকি। ধরুন যদি কলকাতার কোনো অঞ্চলের নাম যদি হয় কাতলা তলা, কিংবা ইলিশ কলোনি তাহলে একটু হাসিই পাবে। কিন্তু অবাক লাগলেও সত্যিই এই কলকাতার বুকেই মাছের নামে একটি জায়গার নাম রয়েছে।

 

একসময় তোপসিয়া বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠত চামড়ার কারখানা আর নোংরা গন্ধ। আজ অবশ্য সেসব নেই।১৯৯৬ সালে আদালতের নির্দেশে কলকাতার পূর্ব দিকের এই অঞ্চলের কারখানাগুলি স্থানান্তরিত হয়েছে শহরের একদম বাইরে। নোংরা, ধোঁয়া, আবর্জনা মিলিয়ে গিয়ে সুদৃশ্য অফিসবাড়ি আর ফ্ল্যাটবাড়িতে ভরে উঠেছে গোটা অঞ্চলটিই। এই এলাকাটিকে ২০০২ সালেই স্যামসার সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যে সব অঞ্চলে জলাভূমির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে এবং যেগুলি পরিযায়ী পাখিদের বিচরণভূমি সেসব অঞ্চলই র‍্যামসার কনভেনশনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তোপসিয়ার জলাভূমিগুলির অস্তিত্ব বজায় থাকেনি। কলকাতা আর তোপসিয়ার সম্পূর্ণ অতি প্রাচীন। ১৭১৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুগল সম্রাট ফারুখসিয়ারের কাছ থেকে কলকাতার আশেপাশের মোট ৩৮টি গ্রামের ইজারা পায়। এবং ১৭৫৮ সালে কোম্পানি সর্বমোট ৫৫টি গ্রাম কিনে নেয় নবাব মীর জাফরের কাছ থেকে। এবং এই গ্রামগুলিই পরবর্তীকালে বৃহত্তর কলকাতার অংশ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
২০০০ বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল যে ফল, আবারও খুঁজে পেলেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা

কলকাতায় মারাঠা ডিচের অস্তিত্বের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল ১৭৬৩ সালে টমাস কিচিনের তৈরি কলকাতার মানচিত্র

ওই ৫৫টি গ্রাম মিলিয়ে গোটা অঞ্চলটির নাম হয় ‘ডিহি পঞ্চান্নগ্রাম’। এই ৫৫টি গ্রাম ছিল মারাঠা ডিচ বা খাতের বাইরে। কলকাতার অংশ হওয়া সত্ত্বেও এই ৫৫টি গ্রাম মারাঠা ডিচের বাইরেই থাকে, এবং মারাঠা ডিচ অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়লে ১৭৯৯ সালে আংশিক এবং ১৮৯৩ সালে সম্পূর্ণভাবে বুঝিয়ে ফেলা হয়। যার ফলে কলকাতার সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে যায় ডিহি পঞ্চান্নগ্রামের। সেইসময় কলকাতা নিবাসী ইতিহাসবিদ, ব্যারিস্টার হ্যারি এভান আগস্ট কটন ‘ক্যালকাটা ওল্ড অ্যাণ্ড নিউ’ নামে তাঁর একটি বইতে উল্লেখ করেন ডিহি পঞ্চান্নগ্রাম ছিল কলকাতার শহরতলি যা ২৪ পরগণা থেকে আলাদা রাখা হয় এবং ১৭৫৭ সালে তা আবারও কলকাতার সঙ্গে জুড়ে দেন মীর জাফর।

 

১৭৮৪ সালে উড সাহেবের তৈরি কলকাতার মানচিত্রে ডিহি পঞ্চান্নগ্রামের অংশ হিসেবে জায়গা পায় তোপসিয়া। কালের ফেলে ডিহি কথাটির বিলুপ্তি ঘটলেও আজও এই অঞ্চলটিকে বলা হয়ে থাকে পঞ্চান্নগ্রাম। কলকাতার পুরোনো ঐতিহাসিক দলিল এবং নথিপত্রে উল্লেখ পাওয়া যায় যে তোপসিয়ার আশপাশে জলাভূমি থাকায় এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষে পেশা ছিল মাছ ধরা। আর তোপসিয়ার নামকরণও সম্ভবত এই পেশার কারণেই হয়েছিল। কলকাতার বিখ্যাত ঐতিহাসিক পি থাঙ্কপ্পন নায়ারের কথা অনুযায়ী দুই বাংলা আর দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বহু জায়গা থেকেই পাওয়া যাওয়া তোপসে মাছ থেকে তোপসিয়া নামটি এসেছে। এই তোপসে মাছের বৈজ্ঞানিক নাম ‘Polynemus paradiseus’। ২০০০ সালে প্রমোটারদের হাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এই এলাকার জলাভূমিতে যথেষ্ট পরিমাণে তোপসে মাছ পাওয়া যেত, এবং এই অঞ্চলের বহু মানুষেরই প্রধান খাদ্য ছিল এই মাছ।

আরও পড়ুন
দীর্ঘ ২৭০০ বছর ধরে দেশ শাসন করে চলেছে এই রাজপরিবার, ১২৬ জন সম্রাট বসেছেন সিংহাসনে

তোপসিয়ার পুরোনো চামড়ার কারখানা

কাজের সন্ধানে আসা মানুষের সংখ্যা দিনদিন যত বাড়তে থাকে ততই এই অঞ্চলের জলাভূমিতে গড়ে উঠতে থাকে চামড়ার কারখানা, এবং তার শ্রমিকদের জন্য বস্তি। এবং ধীরে ধীরে এখান থেকে চামড়ার কারখানা সরে যাওয়ার ফলে এই অঞ্চলে বস্তি এবং খারাখানা ভেঙে তৈরি হয় অফিস এবং ফ্ল্যাটবাড়ি এবং এই অঞ্চলটি হয়ে ওঠে কলকাতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ সেই সঙ্গে রাজারহাট, এয়ারপোর্ট এবং সল্টলেক অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের একটি বড়ো সূত্র।

 

জলাভূমি ভরাট করার পরিবেশ কর্মীদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও আজও অবাধে এখানে চলছে জলাভূমি ভরাটের কাজ। ফলে এই অঞ্চল থেকেও হারিয়ে যেতে বসেছে তোপসে মাছের অস্তিত্ব। বর্তমানে কলকাতার বাজারে এই মাছের জোগান আসে কলকাতার বাইরের বিভিন্ন বাজার থেকে। ফলে এক সময় এই অঞ্চল যে মাছেদের অভয়ারণ্য ছিল আজ আর তাদের খোঁজ মেলে না এই অঞ্চলে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,808FansLike
19FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!