১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১রবিবার

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১রবিবার

তারকেশ্বরের মন্দিরেই হয়েছিল বাংলায় প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন,যোগ দিয়েছিলেন বারবণিতারাও

তারকেশ্বরের মন্দির পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। শ্রাবণ মাস এলেই দলে দলে বাঁক কাধে মানুষজন পায়ে হেঁটে এই মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হন এখানের শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালতে। তবে তারকেশ্বরের এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠার সময় নিয়ে নানা মতভেদ চালু রয়েছে। একদল মানুষের মতে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা রাজপুত রাজা ভারমল্ল। নামের সঙ্গে মল্ল থাকায় তারা ভারমল্লকে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের বংশোভুক্ত বলে মনে করেন। 

 

প্রচলিত মত অনুযায়ী ভারমল্লর গোয়ালা মুকুন্দ ঘোষ তারকেশ্বর মন্দিরের প্রথম সেবাইত ছিলেন। আরও মত যে মুকুন্দ ঘোষই প্রথম জঙ্গলে বাবা তারকনাথের শিলা আবিষ্কার করেছিলেন। ভারমল্ল এরপরই মুকুন্দ ঘোষকে সেবাইত নিযুক্ত করে নির্দেশ দেন যে এই মন্দিরের মোহান্তরা চিরকাল ব্রহ্মচারী থেকে তারকনাথের সেবা করবেন। তারকেশ্বরের মন্দিরের পুরোহিতদের বলা হত মোহন্ত। পরবর্তীকালে শঙ্করাচার্য তারকেশ্বরে ‘দশনামী সন্ন্যাস’ ঘরানার মঠ প্রতিষ্ঠা করলে, তারকেশ্বর মন্দিরের সেবার ভার এই মঠের মোহন্তদের হাতে যায়। কিন্তু সেই সময় প্রবল ক্ষমতাশালী এই মহান্তরা নানা রকম কুকীর্তিতে জড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে নারীঘটিত ব্যাপারও ছিল। ধীরে ধীরে মোহান্তদের অত্যাচারে ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে সাধারণ মানুষ। শেষমেষ এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ১৯২৩ সাল নাগাদ।

আরও পড়ুন
ভয়ঙ্কর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে শিরোনামে অস্ট্রেলিয়ার সাঁতার কোচ

তারকেশ্বরের মন্দিরেই হয়েছিল বাংলায় প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন,যোগ দিয়েছিলেন বারবণিতারাও
একদল মানুষের মতে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা রাজপুত রাজা ভারমল্ল

১৯২৩ সালে হাওড়ার এক উকিল সস্ত্রীক তারকেশ্বরে পুজো দিতে যান। সেখানে তাঁর স্ত্রীকে একটি ঘরে জোর করে বন্দী করে রাখেন তৎকালীন মহান্ত সতীশ গিরির লোকেরা। সেই মহিলা কোনো রকমে সেই ঘরে থাকা একটি কাটারি দিয়ে জানালা কেটে বেরিয়ে পালিয়ে আসেন স্টেশনের কাছাকাছি। সেই সময় সেখান দিয়ে শিকার শেষে বাড়ি ফিরছিলেন দুই ইংরেজ সাহেব। তাদের কাছে কাকুতি মিনতি করে সেই মহিলা সে যাত্রায় উদ্ধার পান। কিন্তু এই ঘটনাটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতেই শোরগোল পড়ে যায়। 

 

 
তৎকালীন ‘ব্রাহ্মণ সভা’র গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব শ্যামলাল গোস্বামী বিষয়টির সরেজমিনে তদন্ত করতে তারকেশ্বর মঠে যান এবং ঘটনাটির যথার্থতা্র বিষয়ে নিশ্চিত হন। এরপরেই ‘ব্রাহ্মণ সভা’র দুই সন্ন্যাসী বিশুদ্ধানন্দ স্বামী এবং সচ্চিদানন্দ স্বামী এর প্রতিবাদে ‘ব্রাহ্মণ-সভা’কে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানান। কিন্তু ‘ব্রাহ্মণ-সভা’ তখন কোনো আগ্রহ দেখায়নি। এমনকি তৎকালীন সরকারও বিষয়টি সম্পর্কে ছিলেন উদাসিন। এরকম সময়ে এই সামাজিক অন্যায়টি নানা পাকেচক্রে রাজনৈতিক মাত্রা পায়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ খবর পাওয়া মাত্রেই সতীশ গিরি মহান্তের পদত্যাগের দাবিতে তারকেশ্বরে এক সত্যাগ্রহ করেন। সেখানে দলে দলে যোগ দিতে থাকেন হুগলি সহ হাওড়ার বহু সংগঠনও।

আরও পড়ুন
কুয়ো খুঁড়তে গিয়ে পাওয়া গেলপৃথিবীর সর্ববৃহৎ নীলকান্তমণির স্তূপ

তারকেশ্বরের মন্দিরেই হয়েছিল বাংলায় প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন,যোগ দিয়েছিলেন বারবণিতারাও
মুকুন্দ ঘোষই প্রথম জঙ্গলে বাবা তারকনাথের শিলা আবিষ্কার করেছিলেন

সময়টা ১৯২৪ সাল। দেশবন্ধু তখন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি। তিনি আন্দোলন উপলক্ষে কলকাতার তৎকালীন মির্জাপুর পার্ক, যা বর্তমানে শ্রদ্ধানন্দ পার্ক নামে পরিচিত – সেখানে সভা করলেন। শুধু তাই নয় তিনি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে তদন্তে নামলেন। সেই সঙ্গে বাংলার যুবসমাজকে ডাক দিলেন এই সত্যাগ্রহ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। যদিও ইংরেজ সরকার এই আন্দোলনকে Colossal Hoax বলে দাগিয়ে দেয়।

 

তবু আন্দোলনে এক তিল ভাঁটা পড়েনি। বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলে এর পারদ। হাওড়ার বালি অঞ্চলের বিখ্যাত ব্যবসায়ী এবং পৌর কমিশনার বনওয়ারীলাল রায়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সচ্চিদানন্দ স্বামী এবং বিশুদ্ধানন্দ স্বামী বনওয়ারীলালের বাড়িতে থেকে সত্যাগ্রহীদের সঙ্গ দিতে থাকেন। শালকিয়া থেকে যোগ দেন ডাঃ শম্ভুচরণ পাল, সুধীর মজুমদার, উপেন চৌধুরীরা। তারকেশ্বরে গঠন করা হয় ‘মহাবীর দল’। যার সভাপতি হন হুগলির প্রত্যন্ত গ্রাম নতিবপুরের বলাই চন্দ্র সিং। এছাড়া, হাওড়ার নানা প্রান্ত থেকে যোগ দেন অনেকে, যেমন – মধ্য হাওড়ার সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, অমরাগড়ীর পুলিনবিহারী রায়, বালিচকের কার্তিকচন্দ্র পাত্র, কদমতলার অনাদি মুখার্জি প্রমুখরা।

আরও পড়ুন
শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য তৈরী হওয়া এই ভাষার নাগাল পায়নি কোনও পুরুষ!

তারকেশ্বরের মন্দিরেই হয়েছিল বাংলায় প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন,যোগ দিয়েছিলেন বারবণিতারাও
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ সতীশ গিরি মহান্তের পদত্যাগের দাবিতে তারকেশ্বরে এক সত্যাগ্রহ করেন

সেই সময় দলে দলে যুবকেরা এই আন্দোলনে সামিল হতে থাকেন। তারা সকলেই সত্যাগ্রহী। বালির কংগ্রেসকর্মী মোহিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ভার পড়ে নিয়মিত সত্যাগ্রহী সংগ্রহের। সেই সময়ের হিসেব অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় পাঁচজন করে সত্যাগ্রহী পাঠানো হত এবং পাঁচজনেই হতেন গ্রেফতার। এরকমভাবে প্রায় ১৫ দিন টানা সত্যাগ্রহী পাঠাতে থাকেন তিনি। তবু আন্দোলন থেমে থাকেনি।একটাই দাবি ছিল এই আন্দোলনের, মোহান্ত বদল।

 

শুধু কংগ্রেসীরা বা যুব প্রজন্ম নয়;  এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সেই সময় বারবনিতারা পর্যন্ত প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমে পড়েছিল। তারা বাড়ি বাড়ি গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করত। তাদের গানের ভাষা ছিল – “ভিক্ষা দাও গো ভিক্ষা দাও গো/ এসেছি ভিক্ষা করিয়া সার/ তারকেশ্বর ভেসেছে পাপেতে/ করিছে সবাই হাহাকার/ সচ্চিদানন্দ বিশ্বানন্দ গুণাধার/ রুধিলে দানে কারাবরণে/ করিছে দেশের পাপ সংসার।” 

আরও পড়ুন
প্রচুর অর্থ ব্যায়ে তৈরি অলিম্পিক ভিলেজের শেষ পরিণতি কি? জানলে অবাক হবেন আপনিও

তারকেশ্বরের মন্দিরেই হয়েছিল বাংলায় প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন,যোগ দিয়েছিলেন বারবণিতারাও
তারকেশ্বর সত্যাগ্রহে যোগ দেওয়া বাংলার যুবসমাজ

এই আন্দোলনের শেষপর্যন্ত চিত্তরঞ্জনের জয় হয়। আন্দোলনের জয় হয়। জয় হয় প্রতিবাদের। যদিও সতীশ গিরি এই মহিলা বন্দীকে তান্ত্রিক ক্রিয়া বলে চালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন হুগলির জেলা জর্জ কে.সি.নাগ তা অস্বীকার করেন এই দাবিতে যে শংকরাচার্য ঘরানার এই মঠ বৈদিক সংস্কৃতির অংশ। তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ এখানে যায় না। চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে এই আন্দোলনে বারবনিতাদের যোগদান এই আন্দোলনকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছিল, এই আন্দোলনের ইতিহাস সেভাবে বাংলার ইতিহাসে তেমনভাবে জনপ্রিয় হয়নি। 

 

সূত্র – পাঁচশো বছরের হাওড়া, হেমেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,808FansLike
19FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!