১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

আত্মরক্ষার্থে পৃথিবীর প্রথম ফ্ল্যাটবাড়ি গড়ে উঠেছিল এই দেশে

বিশেষজ্ঞরা বলেন এই দুনিয়ায় কোনো কিছুই এমনি বা শখ করে হয়নি, প্রয়োজন থেকেই মানুষ সমস্ত কিছু গড়ে তুলেছে। সেই সমস্ত সৃষ্টি‌ই এক সময়ে হয়ে উঠেছে অপার বিস্ময়ের কারণ। এই যে ফ্ল্যাট বাড়ি দেখি, অনেকেই মনে করেন বাসগৃহকে সুন্দর করে তুলতে এবং একই জায়গায় বেশি সংখ্যক মানুষের থাকার ব্যবস্থা করে দিতেই এর সূচনা হয়। কথাটা কিন্তু খুব একটা ভুল নয়, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে সবার মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে হলে এ ছাড়া বিকল্প আর কিছু নেই। তাই বর্তমান সময়ে বাড়ির পরিবর্তে ফ্ল্যাটের প্রচলন বেড়ে যেতে দেখছি।

 

এখানেই কৌতুহল তৈরি হতে পারে কবে থেকে ফ্ল্যাট বাড়ির প্রচলন হল? বেশিরভাগ সময়ে আমরা খুব কিছু না জেনেই মন্তব্য করে বসি সম্ভবত পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকেই ফ্ল্যাট বাড়ির ধারণা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেছে। এই কথাটাও কিন্তু অনেকটা ঠিক। আর এখানেই মস্ত বড় ভুলটি করে বসব আমরা। স্বাভাবিক প্রবণতা থেকে আমরা মনে করি ইউরোপ-আমেরিকাতেই প্রথম ফ্ল্যাট বাড়ির প্রচলন ঘটে। ভুল, প্রথম ফ্ল্যাট বাড়ি বা উলম্ব বাসভূমির প্রচলন ঘটেছিল পশ্চিম এশিয়াতে।

আরও পড়ুন
বিপদে আশার আলো, মাত্র ১টাকায় অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে কয়েশো রোগীকে বাঁচালেন এই ব্যবসায়ী

 

আমরা সবাই ইয়েমেন দেশটির কথা জানি। বর্তমানে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত এই দেশটির কথা বারবার শিরোনামে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দৌলতে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের একটি রিপোর্টে থেকে জানা গিয়েছে ইয়েমেনের অর্ধেকের বেশি বাসগৃহ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে গৃহযুদ্ধের ফলে। যদিও এখনও থামার কোনো লক্ষণ নেই এই গৃহযুদ্ধের। একদিকে আছে ইরানের মদতপুষ্ট হুথি’রা, অন্যদিকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরব জোট মদত দিচ্ছে সেদেশের তথাকথিত সরকারি বাহিনীকে।

এই ইয়েমেনের‌ই একদল বাসিন্দা প্রথম উলম্ব বাসস্থানের সঙ্গে বিশ্ববাসীকে পরিচয় করিয়ে দেন। বলা যেতে পারে এটিই ছিল আজকের ফ্ল্যাট বাড়ির সূচনাকাল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল সেই পুরানো উলম্ব বাড়িগুলি আজও একই রকম ভাবে দাঁড়িয়ে আছে এবং সেখানে মানুষ বসবাস করে।

 

ইয়েমেনের মধ্যভাগের একটি প্রদেশ হাদ্রামাউত। এই প্রদেশের একটি ছোট্ট শহর শিবাম। এই শহরের বাসিন্দারা আরব বেদুইনদের হাত থেকে বাঁচার তাগিদেই প্রথম অট্টালিকা নির্মাণের কথা ভাবেন। এর ফলে গড়ে ওঠে শিবামের সুউচ্চ অট্টালিকার ছোট্ট শহর। মজার ব্যাপার হল সেই সময়ে এই এক একটি উলম্ব বাড়ি বা অট্টালিকায় কিন্তু একটি করেই পরিবার বসবাস করত।

আরও পড়ুন
এই বাঙালি জনগোষ্ঠির নিয়ম বিয়ের পাকা কথা বলতে পাত্রীর বাড়িতে মদ নিয়ে যেতে হবে পাত্রের বাবাকে!

 

আসলে তখনও মানুষের বসবাস করার জন্য স্থানাভাব ঘটেনি। তাই বাড়ির বদলে ফ্ল্যাটবাড়ি গড়ে তোলার দরকার ছিল না। যেহেতু আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে এই মরু শহরের অধিবাসীরা উলম্ব বাড়ি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়, তাই এখানে প্রতিটি উলম্ব বাড়িতে একটি করে পরিবার‌ই বসবাস করত। এই উলম্ব বাড়িগুলির উচ্চতা খুব একটা কম ছিলনা, বর্তমান সময়ের ৫ থেকে ১১ তলা পর্যন্ত উঁচু ফ্লাট বাড়ির সমান ছিল এদের উচ্চতা।

 

ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায় যীশু খ্রিস্টের জন্মেরও প্রায় ১,৫০০ বছর আগে থেকে শিবামে জনবসতি গড়ে উঠেছিল। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এখানে মানুষ বসবাস করতেন। পরে খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে এই জায়গাটি বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু এই সময় থেকেই এখানে আরব বেদুইন দস্যুদলের উৎপাত শুরু হয়। তারা কেবল হিংস্র ছিল তাই নয় সেইসঙ্গে লুটপাটেও ছিল সিদ্ধহস্ত। এই আরব বেদুইনদের হাত থেকে বাঁচতে এরকম লম্বা বাড়ি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় শিবামের তৎকালীন বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন
পুরুলিয়ার নাচনিদের জীবনের মতোই মিলে গিয়েছে গেইশাদের জীবন, বঞ্চিত সংসার ধর্ম থেকে

 

ঐতিহাসিকদের মতে মোটামুটি ৩০০ সাল নাগাদ এই উলম্ব বাড়িগুলি গড়ে ওঠে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল এই বাড়িগুলি তৈরি করার ক্ষেত্রে পাথর বা পোড়া ইঁটের ব্যবহার করা হয়নি। কাদামাটি দিয়ে তৈরি ইঁট মরুভূমির রোদে শুকিয়ে নিয়ে কাঠের গুঁড়োর মিশ্রণ দিয়ে পরপর করে সাজিয়ে এই অট্টালিকাগুলি গড়ে তোলা হয়। সে দিক থেকে দেখতে গেলে এটিই পৃথিবীর একমাত্র কাদামাটির ইঁটের তৈরি অট্টালিকা।

 

এই বাড়িগুলির প্রথম ও দ্বিতীয় তালায় মানুষ বসবাস করত না। সেখানে মূলত গবাদিপশু ও ব্যবসার জিনিসপত্র মজুদ করে রাখা হত। বেদুইন হানাদারদের হাত থেকে বাঁচতে তিন তলা থেকে বসবাস করতে শুরু করে সাধারণ মানুষজন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল একতলা ও দোতলাতে কোনো জানালা থাকত না। তিন তলা থেকে যেহেতু পরিবারের লোকজন বসবাস করত, তাই সব জানালায় তিন তলা থেকে শুরু হত। এরা প্রতিটি তলার মেঝে তৈরি করেছিল কাঠের পাটাতন দিয়ে। সেইসঙ্গে প্রতিটি অট্টালিকার ছাদে পাথর, গরম জল সবসময় মজুত করে রাখা হত। আরব বেদুইন হানাদাররা আক্রমন করলেই ছাদ থেকে সেগুলি তাদের দিকে নিক্ষেপ করত বাড়িগুলির বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন
এই দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং স্পিকার পদে তিনটি আলাদা আলাদা ধর্মের মানুষকে নিযুক্ত করা হয়!

 

আমেরিকার ম্যানহাটন শহর গগনচুম্বী অট্টালিকার জঙ্গলের জন্য সুপরিচিত। সেই নিদর্শন মাথায় রেখে অনেকেই শিবামের কাদামাটির ইঁটের তৈরি বাড়িগুলিকে ‘মরুভূমির ম্যানহাটান’ বলে চিহ্নিত করে। ৯০৪ সালে এখানে ‘আল মিহদার’ নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সেই মসজিদের একমাত্র মিনারটির উচ্চতা ১৭৫ ফুট, সেটি এখনও অব্দি একই রকমভাবে অবস্থান করছে।

 

ঐতিহাসিকরা জানিয়েছেন শিবামে এখন যে কাদামাটির ইঁটের তৈরি বাড়িগুলি দেখা যায় তা বেশিরভাগই ১৫৩২ সালের বিধ্বংসী বন্যার পর গড়ে উঠেছে। ওই বছর বন্যার ফলে চতুর্থ শতকে গড়ে ওঠা বাড়িগুলির বেশিরভাগই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখনও প্রতি বছর বর্ষার আগে চুন ও কাদামাটির বিশেষ রকম মিশ্রণের প্রলেপ দেওয়া হয় বাড়িগুলির দেওয়ালে। এমনিতেই শিবাম বন্যা প্রবণ এলাকা হওয়ায় কাদামাটির ইঁটের তৈরি এই অট্টালিকাগুলির অবস্থা বর্তমানে বেশ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন
আজও যায়নি জানা আধুনিক প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কারা এই এঁকেছিল এই বিশালাকৃতির ছবি!

১৯৮২ সালে ইউনেস্কো প্রথম শিবামের এই প্রাচীন অট্টালিকাগুলিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। এর পরপরই এই জায়গাটি বিশ্বের মানুষজনের যথেষ্ট নজরে আসে। যদিও ২০০৮ সালের বন্যা এবং ২০০৯ সালে আল-কায়েদার বোমা বিস্ফোরণের ফলে এখানকার অনেকগুলি বাড়ি সম্পূর্ণ ধূলোয় মিশে যায়। বর্তমানে এই প্রাচীন শহরের জনসংখ্যা মাত্র ৭ হাজার। সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষ একসঙ্গে এগিয়ে এসে যদি শিবামের এই অট্টালিকাগুলির রক্ষণাবেক্ষণ না করে, তবে আর কিছু বছরের মধ্যেই এই ঐতিহাসিক শহরটির আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত সেরকমই।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,820FansLike
20FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!