১৩ জুন, ২০২১রবিবার

১৩ জুন, ২০২১রবিবার

একসময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী নগর বর্তমানে পরিণত হয়েছে একটি ধুঁকতে থাকা দারিদ্র শহরে!

একজন মানুষ যদি ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পদের মালিক হন তবে তিনি ঠিক কতটা ধনী বলে মনে হয়? হয়ত আমার আপনার মত সাধারন মানুষ তার ধন দৌলতের পরিমাণ হিসেব করে উঠতে পারব না। কিন্তু এটুকু জেনে রাখুন এই পরিমাণ ধন-সম্পদ যদি কারও কাছে থাকে তবে তিনি বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট, এলেন মাস্ক- সবার থেকে ধনী! শুনেই চোখ কপালে উঠে গেল! তাহলে আর একটা তথ্য জানানো যাক। এই ধনী ব্যক্তির হাত ধরেই টিম্বাকটু নামে পশ্চিম আফ্রিকার এক মরু নগরী একসময় শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও সম্পদের নিরিখে গোটা পৃথিবীর মধ্যে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছিল। আবার উল্টোদিকে এই টিম্বাকটু শহরটি বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলির অন্যতম আফ্রিকা মহাদেশের রাষ্ট্র মালির প্রধান শহর হয়েও যাবতীয় শ্রী হারিয়েছে।

 

যার হাত ধরে এই শহরটি শিখরে উঠেছিল তিনি হলেন মালির রাজা প্রথম মুসা কেইতা বা মানসা মুসা। আসলে মালির শাসকদের প্রত্যেকেরই উপাধি ছিল মানসা। ১৩১২ খ্রিস্টাব্দে ৩২ বছর বয়সে তিনি মালির সিংহাসনে বসেন। ঐতিহাসিকরা হিসাব করে দেখেছেন মানসা মুসার যে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি ছিল তা বর্তমানের অর্থ মূল্যে হিসাব করলে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি দাঁড়াবে!

আরও পড়ুন
কলকাতার জনারণ্যে লোকচক্ষুর আড়ালেই অদ্ভুতভাবে পালিত হয় চিনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

একসময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী নগর বর্তমানে পরিণত হয়েছে একটি ধুঁকতে থাকা দারিদ্র শহরে!
যার হাত ধরে এই শহরটি শিখরে উঠেছিল তিনি হলেন মালির রাজা প্রথম মুসা কেইতা বা মানসা মুসা

এই মানসা মুসা মালির সবচেয়ে বৃহত্তম শহর টিম্বাকটুতে আফ্রিকার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে একসঙ্গে ২৫,০০০ শিক্ষার্থী অধ্যায়ন করতে পারত। এছাড়া মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার পর পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ লাইব্রেরী টিম্বাকটুতেই গড়ে উঠেছিল। মানসা মুসার এই যে বিপুল পরিমাণ ধন সম্পদ ছিল তার অন্যতম কারণ‌ও কিন্তু টিম্বাকটু। তৎকালীন সমগ্র আফ্রিকা এবং আরব দুনিয়ার প্রতিটি প্রধান বাণিজ্যিক পথ এই এলাকার ওপর দিয়ে গিয়েছিলো। সেই জন্য বণিকদের কাছ থেকে টিম্বাকটুতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা হত। সেই সময় আফ্রিকায় একের পর এক সোনার খনি আবিষ্কার হচ্ছিল। সেই সোনার খনিগুলির মূল বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল তৎকালীন টিম্বাকটু। এছাড়া সাহারা মরুভূমির খনিজ লবণ রপ্তানির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয় এই শহর।

 

টিম্বাকটু সমৃদ্ধশালী হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। এই মরু নগরীতে অনেক আগেই তামার খনি আবিষ্কৃত হয়। তবে টিম্বাকটু নগর গড়ে ওঠার পিছনে একটি লোকোকথা প্রচলিত। এই মরু নগরটিকে প্রথম লোকচক্ষুর অন্তরাল থেকে প্রকাশ্যে তুলে আনে পশ্চিম আফ্রিকার যাযাবর জাতি তুয়ারেগরা। লোকোকথা অনুযায়ী তারা এই অঞ্চলে একসময় একটি কুয়ো খনন করেছিল। তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী এই কুয়োর মালিক যেহেতু তুয়ারেগরা ছিল, তাই এই অঞ্চলের মালিকও তারাই হয়ে ওঠে। কিন্তু যাযাবর জাতি হওয়ায় তারা নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে বেশি দিন থাকতে পারত না। সেই জন্য এখানকার বাকটু নামে এক বৃদ্ধাকে কুয়ার দেখভাল করার দায়িত্ব দেয় তারা। এদিকে তুয়ারেগদের কথ্য ভাষা তামশেকে কোনও স্থান বা জায়গাকে টিম বলা হত। লোকোকথা অনুযায়ী কুয়োর দেখভালের দায়িত্ব পাওয়া বাকটু বুড়ির নামানুসারে এই জায়গাটি বাকটুর স্থান বা টিম্বাকটু হিসেবে প্রচলিত হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন
কলকাতার একটি অঞ্চলের নাম এই মাছের নামে, কালের ফেরে সেই মাছেরাই হারিয়েছে অস্তিত্ব

একসময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী নগর বর্তমানে পরিণত হয়েছে একটি ধুঁকতে থাকা দারিদ্র শহরে!
মালি সাম্রাজ্যের মানচিত্র

আবার আধুনিককালে মনে করা হয় যেহেতু এই মরু নগরীর দুই প্রান্তে দুটি মরুভূমির এসে মিশেছে তাই এর নাম রাখা হয়েছে টিম্বাকটু। এই শব্দটির আরবি অর্থ হল দুই মরুভূমির মিলনস্থল। নামের উৎপত্তি নিয়ে যতই বিতর্ক থাক ঐতিহাসিকরা একটা বিষয় নিশ্চিত করে দিয়েছেন, তা হল দ্বাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এই মরু শহরটির গোড়া পত্তন হয়।

 

প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে টিম্বাকটু অঞ্চলে মানুষ বসবাস করত। তার প্রমাণ পাওয়াও গিয়েছে। সেই সময় নাইজার নদীর পলিমাটিতে এই এলাকা সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। এখানে স্থানীয় মানুষরা তখন কৃষিকাজ করে জীবন নির্বাহ করতো। দু’হাজার বছর আগে এখানে প্রথম তামার খনি আবিষ্কার হয়। তখন থেকেই এখানকার বাসিন্দারা নিজেদের মতো করে তামা দিয়ে বাসনপত্র, অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করতে থাকে। লোকোকথায় উল্লেখ আছে এই অঞ্চলে সোনার খনি ছিল। যদিও তার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন
২০০০ বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল যে ফল, আবারও খুঁজে পেলেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা

একসময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী নগর বর্তমানে পরিণত হয়েছে একটি ধুঁকতে থাকা দারিদ্র শহরে!
সেই সময় নাইজার নদীর পলিমাটিতে এই এলাকা সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল

ঐতিহাসিকদের মতে টিম্বাকটুকে নগর হিসেবে গড়ে তোলার কাজ তুয়ারেগরা শুরু করে। তবে ত্রয়োদশ শতকে এই এলাকাটি তৎকালীন মালি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে এই শহরটি মালি দেশের সর্ববৃহৎ শহর। সানদিয়াতা কেইতার নেতৃত্বে যে মালি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা অপরাজেয় হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে তিম্বাকটু নগরের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি বলে ঐতিহাসিকরা জানিয়েছেন। তাদের মতে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ এই নগরের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় এখান থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করত মালির শাসকরা। সেই অর্থের সাহায্যেই তারা পার্শ্ববর্তী ঘানা, ইরিত্রিয়া, নাইজারের একাংশ নিজেদের কব্জায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

 

মানসা মুসা মালির সম্রাট হবার পর টিম্বাকটু নগরের সমৃদ্ধি শিখর ছোঁয়। তিনি হজ করে ফেরার সময় আরব দেশ থেকে বিভিন্ন পন্ডিত, বিখ্যাত স্থপতিদের নিয়ে এসেছিলেন। তারপরই টিম্বাকটুতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মসজিদ গড়ে তোলা হয়। এখানে গড়ে ওঠে আফ্রিকার প্রথম তথা তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। টিম্বাকটু শহরে মানসা মুসার নিয়ে আসা পণ্ডিতরা কয়েক লক্ষ বই রচনা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন
দীর্ঘ ২৭০০ বছর ধরে দেশ শাসন করে চলেছে এই রাজপরিবার, ১২৬ জন সম্রাট বসেছেন সিংহাসনে

একসময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী নগর বর্তমানে পরিণত হয়েছে একটি ধুঁকতে থাকা দারিদ্র শহরে!
মানসা মুসা মালির সম্রাট হবার পর টিম্বাকটু নগরের সমৃদ্ধি শিখর ছোঁয়

একসময় ইসলামিক শাসনের প্রাণ কেন্দ্রে পরিণত হ‌ওয়া টিম্বাকটুর পতন শুরু হয়ে যায় মালি সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে। তারপর সোংঘাই শাসকরা মালি দখল করে। তাদের আমলে টিম্বাকটু মিশ্র পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু ১৫৯১ সালে মরক্কোর কাছে সোংঘাইরা হেরে যাওয়ার পর টিম্বাকটু তার যাবতীয় গৌরব হারিয়ে ফেলে।

 

যে মালি একসময় মানসা মুসার দৌলতে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী দেশে পরিণত হয়েছিল, সেই দেশটিই বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলির অন্যতম একটি। এই দেশে না আছে রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা, না আছে মানবাধিকার, না আছে উন্নত মানের জীবনযাপনের সুযোগ। মাত্র ৫৭ বছর বয়সে প্রয়াত হন মানসা মুসা। তখন তিনি বিপুল পরিমাণ ঐশ্বর্য রেখে গিয়েছিলেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। যদিও পরবর্তী প্রজন্মের অযোগ্য শাসকদের কারণে মালি আর সেই অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেনি। মালির পাশাপাশি টিম্বাকটুর‌ একই পরিণতি হয়।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,808FansLike
19FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!