১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আলু ছুঁড়ে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল সাবমেরিন!

যুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশ নানান ধরনের কৌশল অবলম্বন করে থাকে। একসময় তীর-ধনুক দিয়ে যে যুদ্ধ হত, তা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আজ পরিণত হয়েছে মেশিন নির্ভর ব্যবস্থায়। বর্তমানে একটা সুইচ অন করলেই মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। যুদ্ধ যখন এইরকম আধুনিক পর্যায় এসে পৌঁছেছে, তখনও কিন্তু পুরানো অস্ত্রগুলোর ব্যবহার শেষ হয়ে যায়নি। আজও মুখোমুখি দুপক্ষের মধ্যে যুদ্ধ হওয়ার সময় বন্দুকের গুলি ফুরিয়ে গেলে একে অপরের ওপর ছুরি, পাথর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে এরকমই এক লড়াই দেখা গিয়েছে লাদাখের গালোয়ান অঞ্চলে। সেখানে ভারতীয় সেনাদের ওপর চীনা সেনাবাহিনী রড, কাঠের বাটাম, ছুরি এসব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

এগুলো সবই যুদ্ধের অনুষঙ্গ। কিন্তু ছুরির সাহায্যে কেউ যুদ্ধ ট্যাংক ধ্বংস করেছে বা পাথর ছুঁড়ে যুদ্ধবিমানকে ধ্বংস করে দিয়েছে এরকম ঘটনা কখনোই ঘটেনি। আসলে এরকম ঘটনা ঘটা সম্ভব নয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে অসম্ভব হলেও এরকম কিছু ঘটনার নজির পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাসে আছে। স্রেফ খাবার আলু ছুঁড়ে ডুবোজাহাজ অর্থাৎ সাবমেরিন ধ্বংস করে দেওয়ার নমুনা এই পৃথিবীতেই আছে!

সেই মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ও’ব্যানন

কথাটা শুনতে খুবই অস্বাভাবিক। তবে ফ্ল্যাশ ব্যাকে যাওয়া যাক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে জাপানের রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়। সেই সময় জাপানি রয়্যাল নেভির শক্তি খুব একটা কম ছিল না। এই লড়াইগুলিতে আমেরিকার প্রধান সহায়ক হয়েছিল ফ্লেচার ক্লাসের যুদ্ধজাহাজগুলি। এই শ্রেণীর যুদ্ধজাহাজগুলির সাহায্যে সাবমেরিন ধ্বংস করার পাশাপাশি যুদ্ধবিমানকে গুলি করে ধ্বংস করে দেওয়া যেত। মূলত জাপানের রয়্যাল এয়ারফোর্সের যুদ্ধবিমান আটকাতেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ফ্লেচার ক্লাসের ডেস্ট্রয়ারগুলি মোতায়েন করেছিল আমেরিকা।

ইউএসএস ও’ব্যানন ছিল এ রকমই একটি ফ্লেচার ক্লাসের যুদ্ধজাহাজ। এরকম সর্বমোট ১৭৫ টি ডেস্ট্রয়ার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা হয় আমেরিকার পক্ষ থেকে।ইউএসএস ও’ব্যানন যুদ্ধজাহাজটির দায়িত্ব ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাকি মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলিকে রসদ সরবরাহকারী অয়েল ট্যাঙ্কার, খাবার-দাবার বহনকারী জাহাজ ইত্যাদিগুলিকে নিরাপত্তা প্রদান করা। সফলতার সঙ্গেই এই জাহাজটি নিজের দায়িত্ব পালন করেছিল।

গুয়াডাল ক্যানাল নৌ-যুদ্ধে মার্কিন ব্যাটলশিপের ফায়ারিং

 

১৯৪৪ সালে আমেরিকার রসদ সরবরাহকারী জাহাজগুলিকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়ে পরবর্তী গন্তব্যস্থলের দিকে রওনা দিয়েছিল ইউএসএস ও’ব্যানন যুদ্ধ জাহাজটি। রাতের গভীর অন্ধকারে সমুদ্র পথে যাতায়াত করার ফলে আগে থেকে জাপানের কাইচু-৬ শ্রেণীর সাবমেরিন আর-ও-৩৪ কে দেখতে পায়নি এই মার্কিন যুদ্ধজাহাজ। ঠিক সেই সময়েই সাবমেরিনের ব্যাটারি চার্জ করার জন্য জল থেকে ওপরে উঠে এসেছিল আর-ও-৩৪। যুদ্ধের পরিস্থিতি থাকায় যাবতীয় আলো বন্ধ করে রেখেছিল এই জাপানি সাবমেরিনটি। বেশ কয়েকদিন বদ্ধ অবস্থায় জলের তলায় থাকার ফলে এই সাবমেরিনটির জাপানি সৈনিকদের একাংশ গেটের ওপরে গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে বিশ্রাম করছিল।

ইউএসএস ও’ব্যাননের রেডার এই জাপানি সাবমেরিনটির কাছাকাছি চলে আসার পর তাকে চিহ্নিত করে। যদিও রেডারে আর-ও-৩৪ কে জলে পাতা মাইন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন ধ্বংস করার জন্য জলপথে দেশগুলি এক বিশেষ ধরনের মাইন পেতে রাখত। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টিকে অতটা গুরুত্ব না দিয়ে ইউএসএস ও’ব্যাননের কমান্ডার মাইনটিকে এড়িয়ে নির্দিষ্ট পথেই জাহাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

জাপানি ব্যাটলক্রুজার Hiei

 

কিন্তু বিধি বাম, মাত্র কয়েক মিটার দূরত্ব থেকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজটির কর্মীরা বুঝতে পারেন তারা যাকে মাইন ভেবেছিলেন তা আসলে একটা জাপানি সাবমেরিন। তারা দ্রুত ইউএসএস ও’ব্যাননকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শত চেষ্টা সত্ত্বেও মার্কিন যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে জাপানি সাবমেরিনের গায়ে ধাক্কা লেগে যায়। এই সংঘর্ষের ফলেই সাবমেরিনের জাপানি সেনারা বুঝতে পারেন গোটা পরিস্থিতিটি। তাড়াতাড়ি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ধ্বংস করার জন্য তারা প্রস্তুত হয়ে যান।

তৎকালীন সময়ে সাবমেরিনের ডেকের ওপর ‘ডেক গান’ বলে এক বিশেষ ধরনের শক্তিশালী বন্দুক থাকত। যার সাহায্যে বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজের ওপর আক্রমণ করা হত। কিন্তু ইউএসএস ও’ব্যানন অত্যন্ত কাছে অবস্থিত থাকায় জাপানি সাবমেরিনের সেনারা ডেক গান ব্যবহার করতে পারেনি। কারণ তাতে তাদেরও ক্ষতি হতে পারত। ঠিক একই কারণে মার্কিন জাহাজটিও সাবমেরিনকে লক্ষ্য করে শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেনি। সে ক্ষেত্রে সাবমেরিনের পাশাপাশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজটিও ক্ষতিগ্রস্ত হত।

জাপানি সাবমেরিন RO-33, RO-34

এই অবস্থায় জাপানি সাবমেরিনের সেনারা হঠাৎই মার্কিন জাহাজকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইউএসএস ও’ব্যাননের এক রাঁধুনী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে অন্ধকারের মধ্যেই সাবমেরিনটি লক্ষ্য করে হাতের সামনে থাকা খাবার আলু ছুঁড়তে শুরু করে। অন্ধকার হ‌ওয়ায় জাপানিরা ভেবেছিল সাবমেরিন লক্ষ্য করে মার্কিন সেনারা গ্রেনেড ছুঁড়ছে। বিপদ থেকে বাঁচতে তারা তৎক্ষণাৎ সাবমেরিনটি নিয়ে জলের তলায় ডুব দেয়। এই সুযোগের‌ই বোধহয় অপেক্ষায় ছিল ইউএসএস ও’ব্যানন। মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি তৎক্ষণাৎ জলের ভেতর ডুব দেওয়া জাপানি সাবমেরিন লক্ষ্য করে ডেপথ চার্জ করে। এটি আসলে এক ধরনের মাইন। জলের তলায় গিয়ে এই মাইন ফেটে গেলে প্রচন্ড জলের চাপ তৈরি হয়। সেই চাপের ফলেই সাবমেরিন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। আর-ও-৩৪ সমুদ্রের মাত্র ৭৫ মিটার গভীরতা পর্যন্ত নামতে পারত। তার বেশি গভীরে গেলে জলের চাপে এমনিতেই ভেঙ্গে পড়ার কথা ছিল এই জাপানি সাবমেরিনটির। কিন্তু মার্কিন জাহাজের নিক্ষেপ করা মাইন বিস্ফোরণ ঘটে প্রবল জলের চাপ তৈরি হয়। সেই চাপের কারণেই জাপানি সাবমেরিনটি দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে যায়, ৬৬ জন সেনার‌ই সলিল সমাধি ঘটে।

আলু যুদ্ধের স্বীকৃতি ফলক

যদিও ইউএসএস ও’ব্যাননের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কমান্ডার আলু ছোঁড়ার ঘটনার কথা অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু ওই জাহাজের বেশ কয়েকজন ক্রু বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন জাপানি ডুবোজাহাজ লক্ষ্য করে আলু ছোঁড়ার ঘটনাটি সত্য।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,820FansLike
20FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!