১৩ জুন, ২০২১রবিবার

১৩ জুন, ২০২১রবিবার

বিজয়ীর মেডেল হিসাবে মানুষের মাথা উপহার দিত এই আদিবাসী গোষ্ঠী

আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নানা ধরনের রীতি রেওয়াজ যে প্রচলিত ছিল তা আমরা অনেকেই জানি। আধুনিক সভ্যতার সর্বগ্রাসী প্রভাবের মধ্যেও পৃথিবীর নানা প্রান্তে এখনো অনেক আদিম জনগোষ্ঠী থেকে গিয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই সভ্য সমাজ থেকে আজ‌ও নিজেদের আলাদা করে রেখেছে। অনেকেই আবার সভ্য সমাজের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সভ্য সমাজের সঙ্গে সহবস্থানে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা আদিম জনগোষ্ঠীর কথা বলতে গেলে প্রথমেই মাথায় আসবে মাওরি বা মাউরি দের কথা।

 

পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত একটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র হলো নিউজিল্যান্ড। পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা উন্নত দেশগুলোর অন্যতম হল এই দেশ। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মান খুবই উন্নত। আর এই উন্নয়নের ছোঁয়া পরবর্তীকালে এসে পড়েছে আদিম জনগোষ্ঠী মাউরিদের ওপরেও। নিজেদের ঐতিহ্য বজায় রেখেই মূলস্রোতের মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছে নিউজিল্যান্ডের এই আদিবাসীরা। এমনকি নিউজিল্যান্ডের উপ প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মাউরি গোষ্ঠীভুক্ত উইনস্টন পিটারস।

 

আবেল তাসমানের ট্র্যাভেল জার্নালে মার্ডার্স বেতে মাওরির প্রথম ইউরোপীয় ছাপ (1642)

 

প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূখণ্ড পলিনেশিয়াকে মাউরিদের উৎপত্তিস্থল বলে মনে করেন নৃতত্ত্ববিদরা। আনুমানিক ১২৫০ থেকে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী পলিনেশিয়া থেকে বর্তমান নিউজিল্যান্ডে এসে বসতি স্থাপন করে। সেই সময় নিউজিল্যান্ড প্রায় জনশূন্য ছিল। এই জনগোষ্ঠীই সম্ভবত প্রথম এখানে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করে। পলিনেশিয়া থেকে আগত ১২ টা গোত্র বা গোষ্ঠী পরবর্তীতে একত্রিত হয়ে মাউরি সংস্কৃতি গড়ে তোলে এবং মাউরি নামে পরিচিত হয়। কেবলমাত্র নিউজিল্যান্ডেই নয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় আরেক রাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়াতেও মাওরিরা বসবাস করে।

 

আরও পড়ুন

ভারতের এই আশ্চর্য মন্দিরে শূন্যে ভেসে থাকে পাথরের থাম

 

মাউরিরা সাধারণত যোদ্ধা জাতি না হলেও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই প্রাচীনকাল থেকেই মাঝেমধ্যেই হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে মাউরিদের কাঠ খোদাই শিল্প পৃথিবী বিখ্যাত। আসবাবপত্র, নৌকা, হস্তশিল্প প্রভৃতিতে এই আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষরা যে অসামান্য নকশা ফুটিয়ে তোলে তার কদর গোটা বিশ্ব জুড়েই আছে।

 

জেমস কুক এবং তাঁর ক্রুদের দ্বারা দেখা উল্কি (মোকো) সহ এক মাওরি প্রধান

 

মুখভর্তি বিচিত্র ধরনের নক্সা বা উল্কি আঁকা হল এই জনগোষ্ঠীর চিরাচরিত ঐতিহ্য। সামাজিক মর্যাদা ভেদে এই সমস্ত উল্কি বদলে যায়। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও উচ্চশ্রেণির প্রতিনিধিরা মুখের সঙ্গে সঙ্গে চিবুক ও ঘাড়েতেও উল্কি অঙ্কন করে। আজও মাউরিদের উৎসব-অনুষ্ঠানে মুখে এই ধরনের উল্কি আঁকতে করতে দেখা যায়। অতীতে আট বছর বয়স পর্যন্ত মাউরি শিশুরা কোনো পোশাক পরতো না। যদিও বর্তমান সময়ে সভ্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে এই রীতির পরিবর্তন ঘটেছে।

 

 কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি মারা গেলে শেষকৃত্যের সময় দেহ থেকে মাথা আলাদা করে নিত এরা

 

বিশিষ্ট মাউরি ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর মাথা সংরক্ষণ করে রাখা এই আদিম জনগোষ্ঠীর রীতি ছিল। দলপতি, পুরোহিত বা অন্য কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি মারা গেলে শেষকৃত্যের সময় দেহ থেকে মাথা আলাদা করে নিত এরা। এরপর মাথার যাবতীয় পচনশীল অংশ অর্থাৎ চোখ, মস্তিষ্ক ইত্যাদি বের করে মাথাটাকে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে রোদের মধ্যে শুকনো করা হত। যাতে চামড়া নষ্ট না হয়ে যায় সেই উদ্দেশ্যে হাঙরের পাকস্থলী থেকে তৈরি এক রকমের তেল এই মাথা গুলিতে মাখিয়ে দেওয়া হতো। এর ফলে বছরের পর বছর মাথা গুলি অবিকৃত অবস্থায় থাকতো। এই সমস্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য সংরক্ষিত মাথা গুলিকে নকশা করা সুদৃশ্য কাঠের বাক্সে ভরে মৃতের পরিবারকে উপহার দেওয়া হতো।

 

আরও পড়ুন

‘No Excuses’ এক হার না মানা মানুষের উঠে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের কাহিনি

 

পরাজিত সেনা নায়েকের মাথা সংরক্ষিত করে মেডেল হিসাবে জয়ী গোষ্ঠীর সেনা নায়ককে উপহার দেওয়া হতো

 

মাঝে মধ্যে মাউরিদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ঝামেলা লাগলে সেই ঝামেলা কখনো কখনো যুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছে যেত। সেই যুদ্ধে পরাজিত সেনা নায়েকের মাথা সংরক্ষিত করে মেডেল হিসাবে জয়ী গোষ্ঠীর সেনা নায়ককে উপহার দেওয়া হতো। এমনকি অন্য আদিবাসী জাতির সঙ্গে লড়াইয়ে জয় লাভ করার পর মাউরিরা পরাজিত জাতির প্রধান বা রাজার মাথা কেটে একই উপায়ে সংরক্ষন করে নিজেদের দলপতিকে উপহার দিত। সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্যে দুটো গোষ্ঠীর মধ্যে এই ধরনের সংরক্ষিত মাথা আদান-প্রদানের রীতিও প্রচলিত ছিল। মাথাগুলো সংরক্ষণ করার আগে অনেক সময় তাতে নতুন করে উল্কি করা হতো। মাওরি ভাষায় সংরক্ষিত মাথাকে বলা হয় “মোকোমোকাই”। বর্তমানে আমেরিকার নিউইয়র্কের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে বেশকিছু মোকোমোকাই রাখা আছে।

 

আরও পড়ুন

করোনা পরবর্তী আরও এক প্যানডেমিকের মুখে দাঁড়িয়ে পৃথিবী, সচেতন না হলে বাড়বে বিপদ

 

মাওরি ভাষায় সংরক্ষিত মাথাকে বলা হয় “মোকোমোকাই”

 

বর্তমানে নিউজিল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ হল মাউরিরা। এরা এই দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠী। নিউজিল্যান্ডের সর্ব বৃহৎ জনগোষ্ঠী ইউরোপীয়দের সংস্পর্শে এসে কোনো কোনো মাউরি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করলেও, এদের বেশির ভাগ এখনো নিজেদের প্রাচীন লোকধর্ম মেনে চলে। বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে মুখভর্তি বিচিত্র নকশা ও উদ্দাম নাচ মাউরি সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,808FansLike
19FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!