১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

১১ মে, ২০২১মঙ্গলবার

পুরুলিয়ার নাচনিদের জীবনের মতোই মিলে গিয়েছে গেইশাদের জীবন, বঞ্চিত সংসার ধর্ম থেকে

বর্তমান সমাজে মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য নানান রকমের পদ্ধতি প্রচলিত আছে। প্রাচীনকাল থেকেই পুরুষদের মনোরঞ্জনের জন্য মহলাদের ব্যবহার করা হত এবং তারা নানা রকম কৌশলে পুরুষদের মনোরঞ্জন করতেন। তবে সেই সময় মূলত অভিজাত ও পুরুষদের যৌন সুখ মেটানোর মধ্য দিয়ে মনোরঞ্জন করা হত। একটা সময় ছিল যখন শিক্ষিত এবং সর্ব্বগুণসম্পন্ন মহিলারা পুরুষদের মনোরঞ্জন করাকে নিজেদের জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এই ব্যবস্থার বেশ কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। এখন মনোরঞ্জন বলতে মূলত শিল্পকলার কথা বোঝানো হয়।

 

জাপানে পুরুষদের মনোরঞ্জন করার জন্য মহিলাদের শিল্পকলার আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত। তবে মূলত ষোড়শ শতক থেকে এই ধারার প্রচলন অনেক বেশি হয়। এক্ষেত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে শিল্পকলায় দক্ষ এই জাপানি মনোরঞ্জনকারীরা কিন্তু কেউই যৌনকর্মী নয়। এরা অত্যন্ত কঠোর অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে গোটা জীবন শিল্পকলাকে আশ্রয় করে পুরুষদের মনোরঞ্জন করার জন্য অতিবাহিত করেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই জাপানি মনোরঞ্জনকারীরা জীবনে বিয়ে বা ঘর সংসার করতে পারেন না।

আরও পড়ুন
গাজনের ইতিকথা ২- নবাব আলিবর্দি খাঁ গাজন দেখতে এসেছিলেন অম্বুলিঙ্গ শিবের মন্দিরে

জাপানে গেইশাদের অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয়

 

এই বিরল জাপানি মনোরঞ্জনকারীদের গেইশা নামে ডাকা হয়। জাপানি ভাষায় ‘গেই’ শব্দের অর্থ শিল্প আর ‘শা’ শব্দের অর্থ ব্যক্তি। অর্থাৎ যে ব্যক্তি শিল্প চর্চা করেন তাকে গেইশা বলা হয়। এক্ষেত্রে পুরো ব্যবস্থাটাই মহিলাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, এখানে পুরুষ গেইশা বলে কিছু হয় না।এর কিছুটা উদাহরণ পাওয়া যায় আমাদের দেশের পুরুলিয়া জেলার নাচনিদের সঙ্গে। এরা ছেলেবেলা থেকেই তালিম নিয়ে নাচ গানের মাধ্যমে মানুষের মনোরঞ্জন করে থাকেন। কিন্তু এরা সংসার ধর্ম থেকে বঞ্চিত। শুধু তাই নয় এরা যৌনতার ক্ষেত্রেও প্রতারিত হন। এরা যে পুরুষের অধীনে থাকেন তাদের বলা হয় রসিক। এই রসিকরা এদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করলেও কোনো স্বীকৃতি দেন না। গেইশারা অবশ্য এই একটা দিক দিয়ে সৌভাগ্যবান, তারা সংসার ধর্ম পালন করতে না পারলেও যৌন নিপীড়নের শিকার হন না। 

 

জাপানে গেইশাদের অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয়‌ এবং মনে করা হয় সম্ভ্রান্ত এবং গুণী মহিলারাই কেবলমাত্র গেইশা হতে পারে। তবে গেইশা হওয়ার পথে যে কেউ পা বাড়াতে পারে, কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে আসাটা প্রায় অসম্ভব। একটা সময় ছিল যখন পাঁচ বছর বয়সেই শিশু কন্যাদের গেইশা হওয়ার প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে যেত। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঠিক করা হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর এবং ১৫ বছর বয়স হবার পর তবেই কোনো মেয়ে গেইশা হওয়ার পথে পা বাড়াতে পারবে। গেইশা হয়ে উঠতে গেলে জাপানি মেয়েদের তিনটি কঠিন ধাপ পেরোতে হয়- সিকোমি, মিনারাই, মাইকো।

আরও পড়ুন
শরীরে নাচ আর গলায় ঝুমুর নিয়ে রসিকের ঝুমুরিয়া কল্পনাকে জীবন্ত করে তোলে বিনোদিনী নাচনি

ইশা হওয়ার পথে যে কেউ পা বাড়াতে পারে, কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে আসাটা প্রায় অসম্ভব

 

জাপানে সাধারণত দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা গেইশা হওয়ার দিকে পা বাড়ায়। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ১৫ বছর বয়স পূর্ণ হবার পর কোনো একটি গেইশা হানামাচির মধ্যে অবস্থিত স্কুলে ভর্তি হতে হয় তাদের। উল্লেখ্য জাপানে গেইশারা নিজেদের জন্য নির্মিত পৃথক আবাসস্থলে একসঙ্গে বসবাস করে। তাদের এই আবাসস্থল বা বাড়িকে বলা হয় ‘হানামাচি’।অল্প বয়সে এখানকার স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তারা নাচ এবং জাপানি বাদ্যযন্ত্র শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠে। পরীক্ষা নেওয়ার পর ঠিক করা হয় কারা কারা গেইশা হওয়ার জন্য পরের ধাপে যেতে পারবে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হল প্রতিটি হানামাচির দায়িত্বে থাকেন একজন অবসরপ্রাপ্ত গেইশা, তাকে ‘মা’ বলে ডাকা হয়। এই মা প্রাথমিকভাবে অর্থ বিনিয়োগ করে একজন মেয়েকে পরিপূর্ণ গেইশা তৈরি করে। এই প্রথম ধাপকে বলা হয় সিকোমি।

 

দ্বিতীয় ধাপে একজন সম্ভাবনাময় গেইশা হানামাচির কোনো একজন গেইশাকে নিজের পাতানো বড়ো বোন হিসেবে গ্রহণ করে। মোটামুটি এক মাস এই পর্ব চলে। এই সময় ওই বড়ো বোন সম্ভাবনাময় গেইশাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করতে যায়। কাছ থেকে একজন গেইশার যাবতীয় কার্যকলাপ দেখার মধ্য দিয়ে নতুনরা যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করে। একে বলা হয় মিনারাই।

আরও পড়ুন
জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বসন্তে আজ লিঙ্গরাজের উৎসবে

১৫ বছর বয়স হবার পর তবেই কোনো মেয়ে গেইশা হওয়ার পথে পা বাড়াতে পারবে

 

মাইকো অর্থাৎ তৃতীয় ধাপ হল গেইশা হওয়ার চূড়ান্ত পর্ব। এই পর্বে পাতানো বড়ো বোনের ছত্রচ্ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে একজন গেইশা নিজের মতো বিভিন্ন অনুষ্ঠান, উৎসবে অংশগ্রহণ করে শিল্পকলার মাধ্যমে মনোরঞ্জন করেন। এই পর্বে কমপক্ষে পাঁচ বছর চলে। আবার অনেক সময় দক্ষতার তারতম্যের জন্য অনেককে আজীবন মাইকো হয়েই কাটিয়ে দিতে হয়। এই পর্ব থেকেই তারা যে অর্থ উপার্জন করেন তা দিয়ে হানামাচির মা-এর বিনিয়োগ করা অর্থ পরিশোধ করতে শুরু করেন।

 

গেইশারা রীতিমতো বিশেষ ধরনের মেকআপ করে এবং বিশেষভাবে সুন্দর সাজ পোশাক পরে রাস্তায় বের হন। চালচলনের মধ্য দিয়েই বোঝা যায় যে তারা যথেষ্ট সম্ভ্রান্ত এবং উচ্চ শিক্ষিত। প্রতিটি গেইশাকে আবশ্যক হিসেবে জাপানি বাদ্যযন্ত্র ‘শামিসেন’ বাজানো শিখতে হয়। তারা মূলত নৃত্য-গান-বাদ্যযন্ত্র বাজানো ও বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তার মধ্য দিয়ে জাপানের রুচিশীল এবং অভিজাত পুরুষদের মনোরঞ্জন করে থাকেন। তবে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় গেইশাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আগের থেকে অনেকটাই কমেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৩০ সালে নাগাদ জাপানে প্রায় ৮০,০০০ গেইশা ছিলেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমতে কমতে মাত্র ১,০০০-২,০০০ এসে ঠেকেছে। যদিও জাপানের মানুষ এবং সরকার মনে করে সে দেশের সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ গেইশারা।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,820FansLike
20FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!