১৩ জুন, ২০২১রবিবার

১৩ জুন, ২০২১রবিবার

পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো কামানকে ধ্বংস করেছিল নিজের দেশ

বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধাস্ত্রের কথা আমরা নানা সময় শুনেছি। বিশেষ করে সঙ্কট যখন বেশি হয় তখন নানান ধরনের আজব আজব অস্ত্রের উদ্ভব হবার ঘটনা অতীতকাল থেকেই চলে আসছে। কখনও তৈরি হয়েছিল আর্কিমিডিসের হাতের মতো অস্ত্র, আবার কখনও পারমাণবিক বোমার মতো বিধ্বংসী অস্ত্রের সঙ্গে এই মানব সমাজের পরিচয় ঘটেছে মূলত যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই। তবে এবারে আমরা আলোচনা করব এক বিশেষ ধরনের কামানকে নিয়ে, যা আজও পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কমান হিসেবে পরিচিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দৈত্যাকার কামান তৈরি করে জার্মানি, যার নাম ছিল শোয়েরার গুস্তাভ। যদিও এই কামানের মূল ভাবনা ছিল একজন রাশিয়ানের ১৮৪৭ সালে গুস্তাভ কোরি নামে ওই রাশিয়ান ব্যক্তি এই দৈত্যাকার কামানের ধারণা সর্বপ্রথম জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। যদিও এটিকে তখন বলা হত ‘রেল গান’। ১৮৬০ সালে পি ফমিন নামে একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ প্রথম রেল গানকে বাস্তব রূপ দেন। আসলে দৈত্যাকার কামানগুলি সেই সময় সাধারণ রাস্তার ওপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া যেত না, তাকে বিশেষ ধরনের রেল কোচের ওপর স্থাপন করে রেল লাইন বরাবর যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে নিয়ে যাওয়া হত এবং সেখান থেকেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এই কামান থেকে গোলা ছুঁড়ত সেনারা।

আরও পড়ুন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আলু ছুঁড়ে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল সাবমেরিন!

পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো কামানকে ধ্বংস করেছিল নিজের দেশ
একটি ৮০০ এমএম শোয়েরার গুস্তাভ এর গোলা, ইম্পেরিয়াল ওয়ার মিউজিয়াম, লন্ডন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষার সংস্থা ছিল ক্রুপ ইন্ডাস্ট্রিজ। ১৯৪১ সালে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কামান বা রেল গান শোয়েরার গুস্তাভ তৈরি করে এই সংস্থাটি। এই কামানটির মুখের ব্যাস ছিল ৮০ সেন্টিমিটার। এই কামানের মোট দৈর্ঘ্য ছিল ১৫৫.২ ফুট। এর মধ্যে মূল নলের দৈর্ঘ্য ছিল ১০৬.৮ ফুট। মোট ওজন ১৩৫০ টন। এই দৈত্যাকার কামান বহন করতে ৮ টি রেল বগি জুড়ে যতটা জায়গা তৈরি হয়, ঠিক ততটা জায়গা লাগত। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় একে নিয়ে যাওয়ার পর কার্যকরী করে তুলতে ২৫০ জন লোকের ৫৪ ঘন্টা সময় লাগত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই কামানটি থেকে যে গোলা ছোঁড়া হত তার ওজন ছিল ৭ টন। এই কামানের গোলা লক্ষ্যবস্তু থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরবর্তী অবস্থানে থেকে ছোঁড়া যেত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মূলত ফ্রান্সের দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ম্যাজিনো লাইন ভাঙার জন্য হিটলারের নির্দেশে জার্মানি এই দৈত্যাকার কামান তৈরি করে। ঘটনাচক্রে এটি যখন প্রস্তুত হয় তার মধ্যে বেলজিয়ামের ভেতর দিয়ে গিয়ে অর্ডান জঙ্গলের বাঁকা পথ ধরে ফ্রান্সে প্রবেশ করেছে জার্মান বাহিনী। ইতিমধ্যেই তারা সে দেশ কব্জা করে নিয়েছে। তাই শোয়েরার গুস্তাভ কামানকে রাশিয়া কব্জা করার কাজে ব্যবহার করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন হিটলার। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাশিয়ার সেভাস্তোপোলের যুদ্ধে এই দৈত্যাকার কামানকে মোতায়েন করা হয়। মাত্র ৪৮ টি গোলা ছুঁড়তে পেরেছিল এই কামান। উল্লেখ্য একবার গোলা ছোঁড়ার পর কমপক্ষে ৫৪ মিনিট সময় লাগত দ্বিতীয়বার গোলা ছোঁড়ার জন্য। ৪৮ রাউন্ড ফায়ার করার পরেই কামানের ব্যারেল খারাপ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
এক গ্রন্থাগারিক প্রথম পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ করেছিলেন

পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো কামানকে ধ্বংস করেছিল নিজের দেশ
শোয়েরার গুস্তাভ: মানুষের তৈরি এখনও পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো কামান

সেভাস্তোপোলের যুদ্ধে শোয়েরার গুস্তাভ মাত্র ৪৮ রাউন্ড গোলা ছুঁড়েই সেখানকার স্তালিনগ্রাদ দুর্গ, ম্যাক্সিম গোর্কি ১ ও ২ দুর্গ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়। এমনকি সেভাস্তোপোলে সোভিয়েত ইউনিয়নের অত্যন্ত সুরক্ষিত অস্ত্রাগার হোয়াইট ফ্লিক এই দৈত্যাকার কামানের গোলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ঘটনাচক্রে স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধে কামান ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও রাশিয়ার প্রবল শীত শুরু হয়ে যাওয়ায় আক্রমণ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় জার্মানি। এরপর গ্রীষ্মকাল পড়ে যাওয়ায় ১৯৪৫ সালে পরাজয় অনিবার্য বুঝে জার্মান সেনারা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শোয়েরার গুস্তাভ ধ্বংস করে দেয়। তাদের এই বিশেষ যুদ্ধাস্ত্রটি যাতে রাশিয়ার হাতে না পড়ে সে জন্যই এই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

7,808FansLike
19FollowersFollow

Latest Articles

error: Content is protected !!